বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে সামগ্রিকভাবে এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও সব ধরনের পণ্যের আমদানিতে একই চিত্র দেখা যায়নি। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও এসব খাতে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে। ফলে আমদানি কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু খাতে এখনো সীমাবদ্ধতা থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশে মোট ১ হাজার ৩৯৪ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ২১১ কোটি ৮ লাখ ডলার বা ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট ১ হাজার ২৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ১২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং ডলারের সংকট কিছুটা কমে আসায় আমদানিকারকদের ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির সক্ষমতা বেড়েছে। এর ফলে আমদানি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেই যে সমপরিমাণ পণ্য আমদানি সম্পন্ন হচ্ছে, এমনটি নয়। এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তি দুটি আলাদা পর্যায়। নতুন এলসি খোলার মাধ্যমে আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়, আর নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের দায় পরিশোধের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। তাই এই দুই সূচকের প্রবৃদ্ধি আমদানি পরিস্থিতির ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে।
ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
প্রথম দুই মাসে আমদানি খাতের মধ্যে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতে ১২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা বেড়েছে ২৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে, এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে তুলনামূলক কম হারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভোগ্যপণ্যের ১০১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, নিষ্পত্তি বেড়েছে ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ১০ শতাংশ।
ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলায় এই প্রবৃদ্ধি আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এলসি নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় নতুন করে খোলা ঋণপত্রের সবকটির লেনদেন একই সময়ে সম্পন্ন হয়নি বলে পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়।
শিল্পের কাঁচামালে এলসি খোলা প্রায় স্থিতিশীল
শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার পরিমাণে খুব সামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতে ৪২১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪২০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
এ হিসাবে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে মাত্র ৯০ লাখ ডলার বা শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ, এই খাতে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
তবে এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ৩৮০ কোটি ২০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৮৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে নিষ্পত্তি কমেছে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানি উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ খাতে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ প্রায় স্থিতিশীল থাকা এবং নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার বিষয়টি আমদানি প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক চিত্র মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে শিল্প উৎপাদন কমেছে বা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা বেড়েছে, নিষ্পত্তি কমেছে
শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলায়ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৪ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
তবে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
সে হিসাবে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি শিল্পের নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে এই খাতে নতুন এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নতুন ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি কতটা বাস্তব আমদানি ও বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে, তা বুঝতে পরবর্তী সময়ের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আমদানি পরিস্থিতিতে মিশ্র চিত্র
সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে পণ্যের ধরন অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির পার্থক্য রয়েছে। ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে এলসি খোলার পরিমাণ সামান্য বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে। একইভাবে মূলধনী যন্ত্রপাতির নতুন এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তি হ্রাস পেয়েছে।
আমদানি বাণিজ্যের স্থায়ী পুনরুদ্ধার মূল্যায়নে তাই শুধু এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, আমদানি ব্যয় পরিশোধের সক্ষমতা, শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা এবং বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য আপাতত আমদানি কার্যক্রমে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি কতটা ধারাবাহিক হয় এবং বিভিন্ন খাতে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ বাড়ে কি না, তা পরবর্তী মাসগুলোর পরিসংখ্যান থেকে আরও স্পষ্ট হবে।









