রাজধানীর কাঁচাবাজারে আগাম শীতকালীন সবজির সরবরাহ শুরু হয়েছে। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মূলার মতো মৌসুমি সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলেও দাম এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। অধিকাংশ সবজি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টমেটোর দাম কোথাও কোথাও কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর খিলক্ষেত, রামপুরা, মালিবাগ ও কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সবজির পাশাপাশি মাছ, মুরগি এবং গরু-খাসির মাংসের দামও রয়েছে চড়া। ডিমের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরছে না ক্রেতাদের মধ্যে।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজি পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো কেনার সামর্থ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে অনেকের। পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের জন্য সবজি, মাছ, ডিম ও মাংস কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও অনেককে হিসাব করে চলতে হচ্ছে।
অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১৪০ টাকা
রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। করলা ও কাকরোলের দাম ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং ঝিঙা ৮০ টাকা। চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০ টাকায়। পটলের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। কচুর লতি ৮০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ টাকা এবং মূলা ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শসা ও গাজরের দামও তুলনামূলক বেশি। দেশি শসা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০ টাকায়, আর হাইব্রিড শসার দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। গাজরের কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা।
বেগুনের দামও জাতভেদে আলাদা। লম্বা বেগুনের কেজি ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং কালো গোল বেগুন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি টমেটোর দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা বা তারও বেশি।
শীতকালীন সবজির মধ্যে মাঝারি আকারের প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। চালকুমড়া ৬০ টাকা, ফুলকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং বাঁধাকপি ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে কাঁচা পেঁপে ও মিষ্টি কুমড়া মিলছে। প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কয়েকটি সবজি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও অধিকাংশ পণ্যের উচ্চমূল্য ক্রেতাদের বাজেটে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কেনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
ডিমের দাম কমেছে, মুরগি এখনও ব্যয়বহুল
বাজারে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বর্তমানে প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। সাদা ডিমের ডজন ১৩০ টাকা। তবে কিছু বাজারে লাল ডিমের দাম ১৫০ টাকা এবং সাদা ডিমের দাম ১৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায়।
খিলক্ষেতের ডিম বিক্রেতা রহিম বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ডজন ডিমের দাম প্রায় ১০ টাকা কমেছে। সামনে দাম আরও কমতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
তবে মুরগির বাজারে তেমন স্বস্তি নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। কক বা পাকিস্তানি জাতের মুরগির দাম ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা। লেয়ার মুরগির কেজি ৩৮০ টাকা এবং দেশি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৭০০ টাকা।
ডিমের দাম কিছুটা কমলেও মুরগির উচ্চমূল্যের কারণে পরিবারের খাদ্যব্যয় কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যেসব পরিবার নিয়মিত ডিম ও মুরগির মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণ করে, তাদেরও এখন কেনাকাটার পরিমাণ ও খরচের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
মাছের বাজারেও চড়া দাম
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও উচ্চমূল্য লক্ষ্য করা গেছে। আকার ও ওজনভেদে প্রতি কেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। কাতল মাছের দাম ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা। চিংড়ির কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
এ ছাড়া কাঁচকি মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কৈ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং টেংরা ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামের মাছের মধ্যে তেলাপিয়ার কেজি ২৩০ টাকা এবং পাঙাস ২২০ টাকা।
দাম তুলনামূলক কম হলেও তেলাপিয়া ও পাঙাস কিনতেও ক্রেতাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে পরিবারের সবার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাছ কেনা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মাছ বিক্রেতা ফিরোজ বলেন, পাইকারি বাজারে মাছের সরবরাহ আগের তুলনায় কিছুটা ভালো। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় সামনে দাম কমতে পারে। তবে পরিবহণ খরচ ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে খুচরা বাজারে অনেক সময় দাম বেশি রাখতে হয়।
গরু-খাসির মাংসের দামও নাগালের বাইরে
মাছ ও মুরগির পাশাপাশি গরু-খাসির মাংসের উচ্চমূল্য সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। রাজধানীর বাজারে গরুর মাংসের কেজি সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ২৫০ টাকা।
এমন দামে নিয়মিত মাংস কেনা সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কঠিন। দৈনন্দিন খাবারের খরচের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ও সামলাতে হয় তাদের। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে অন্য খাতের খরচ কমানো ছাড়া অনেক পরিবারের সামনে বিকল্প থাকে না।
সবজি, মাছ, ডিম ও মাংস—প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেশি থাকায় একটি পণ্যের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক বাজার খরচে বড় ধরনের স্বস্তি মিলছে না।
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। বাজার করতে আসা জগন্নাথ বলেন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো মিল নেই। প্লেটে আমিষ রাখা এখন বিলাসিতার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই-একটি সবজির দাম কমলেও সামগ্রিক বাজারে স্বস্তি নেই।
সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাজারের এই পরিস্থিতি আরও কঠিন। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে অনেককে পরিমাণ কমাতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ তুলনামূলক সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে সবজি, মাছ, ডিম ও মাংসের দাম বেশি থাকায় একটি পণ্যের পরিবর্তে অন্যটি কিনেও সব সময় খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সবজি ও আমিষের ভারসাম্য রাখা পরিবারের পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাদ্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে সেই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরবরাহ বাড়লেও দাম কমার অপেক্ষা
শীতকালীন সবজির মৌসুম শুরু হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে বাজারে সরবরাহ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ক্রেতারা। সাধারণত মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে উৎপাদন, পরিবহণ ব্যয়, পাইকারি বাজারের পরিস্থিতি ও খুচরা বিক্রির ওপর নির্ভর করে সেই সুবিধা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে কতটা সময় লাগবে।
ক্রেতাদের প্রত্যাশা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা ও অন্যান্য শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমবে। একই সঙ্গে মাছ, মুরগি ও মাংসের বাজারেও স্বস্তি ফিরবে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে সবজির উপস্থিতি বাড়লেও উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতাদের দুর্ভোগ কমেনি। কয়েকটি পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম এখনো বেশি। মৌসুমি সরবরাহ বৃদ্ধির সুফল দ্রুত খুচরা বাজারে পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখা এখন ক্রেতাদের প্রধান প্রত্যাশা।








