,

দিল্লিতে বাঙালি জনবসতি, সিআর পার্কের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের রূপরেখা

ভারতের ঐতিহাসিক রাজকীয় শক্তিপীঠ ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি এবং প্রাচ্য ভারতের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বঙ্গভূমির সম্পর্ক কেবল আধুনিক রাজনীতির ফসল নয়; তা গঙ্গা ও যমুনা অববাহিকার যৌথ সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। প্রাচীন আর্যাবর্তের যুগ থেকেই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে বাণিজ্য, সামরিক অভিযান ও প্রশাসনিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। মধ্যযুগে সালতানাত ও মোগল আমলে গৌড়-বাংলার সুবাদার, দেওয়ান, রাজকীয় প্রতিনিধি এবং সুফি-বৈষ্ণব সাধকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল দিল্লিতে। সতেরো শতকে মোগল স্থাপত্য, রেশম বাণিজ্য ও সুবা বাংলার বিপুল রাজস্ব আদান-প্রদানের সূত্রে যে বঙ্গীয় প্রশাসনিক ও বণিক শ্রেণী তৎকালীন দিল্লিতে সাময়িকভাবে অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন, তাঁরাই উত্তর ভারতীয় সাম্রাজ্যিক রাজনীতির সাথে বঙ্গভূমির অর্থনৈতিক যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন।

দিল্লিতে বঙ্গীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপিত হয় ১৯১১ সালে, যখন ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল সরকার ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাজকীয় শাসনযন্ত্র পরিচালনার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের কার্যালয়, রাজস্ব দপ্তর, ডাক ও তার বিভাগ এবং রেলওয়ের বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ বাঙালি কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষক, কেরানি ও প্রকৌশলী পরিবারসহ নতুন রাজধানী দিল্লিতে চলে আসেন। এই সময়কালেই পুরান দিল্লির কাশ্মীরি গেট, তিমারপুর, গোল মার্কেট এবং কারোল বাগ অঞ্চলে গড়ে ওঠে দিল্লির প্রথম সুসংগঠিত বাঙালি বসতি। ১৯০৯ সালে সূচিত ঐতিহাসিক কাশ্মীরি গেটের সার্বজনীন দুর্গাপূজা, ১৯২০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত দিল্লি কালীবাড়ি, এবং পরবর্তীতে ‘বেঙ্গলি স্কুল’ ও ‘বেঙ্গলি ক্লাব’ দিল্লির সামাজিক ও নাগরিক মানচিত্রে বঙ্গীয় সংস্কৃতির স্থায়ী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত পটভূমি দিল্লির জনমিতিতে আরও একটি বিশাল ও চিরস্থায়ী রূপান্তর নিয়ে আসে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিটেমাটিচ্যুত হাজার হাজার বাঙালি বাস্তুচ্যুত পরিবার, বিশেষ করে কেন্দ্র সরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তদের রাজধানী দিল্লির বুকে স্থায়ী আবাসন দেওয়ার জন্য ১৯৬০-এর দশকে ভারত সরকার দক্ষিণ দিল্লিতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বরাদ্দ করে। এই নতুন জনপদটি তৎকালীন সময়ে ‘ইস্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পারসনস কোলনি’ (EPDP Colony) নামে পরিচিত লাভ করে। পরবর্তীতে বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নামানুসারে এই এলাকাটির পুনর্নামকরণ করা হয় ‘চিত্তরঞ্জন পার্ক’ বা ‘সিআর পার্ক’ (C.R. Park)। দক্ষিণ দিল্লির বুকেই গড়ে ওঠা এই এলাকাটি খুব দ্রুত উত্তর ভারতের ‘ক্ষুদে কলকাতা’ বা বাঙালির সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যার ঐতিহ্যবাহী মার্কেট, বইয়ের দোকান, মাছের বাজার ও রবীন্দ্র ভবন দিল্লির বহুসাংস্কৃতিক রূপের প্রাণস্পন্দনে রূপ নেয়।

জাতীয় রাজনীতি, সিভিল সার্ভিস, উচ্চশিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে দিল্লিতে বাঙালিদের অবস্থান অত্যন্ত সুগভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় (DU), জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠায় ও পাঠদানে বহু বাঙালি অধ্যাপক, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনোত্তর ভারতে পরিকল্পনা কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের আইনি অঙ্গন, কেন্দ্রীয় অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গবেষণা সংস্থা এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে বাঙালি সম্পাদক, সাংবাদিক ও সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া। রাইসিনা হিলসের প্রশাসনিক পরিচালনা থেকে শুরু করে দিল্লির প্রেস ক্লাব ও নীতিনির্ধারক কেন্দ্রগুলোতে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রচিন্তা ও বিশ্লেষণাত্মক ভাবধারা ভারতের জাতীয় প্রগতিতে সার্বক্ষণিক অবদান রেখে চলেছে।

আধুনিক যুগে দিল্লির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (NCR) গঠনের সাথে সাথে বাঙালি সমাজের উপস্থিতি আরও ব্যাপক ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। একদিকে সিআর পার্ক বা মিন্টো রোডের মৃত্তিকাশিল্পীরা শারদোৎসবের প্রতিমা নির্মাণে এবং মেদিনীপুর ও নদীয়ার কারিগররা স্বর্ণশিল্প ও কুটির শিল্পে দিল্লির স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন; অন্যদিকে নয়ডা, গুরগাঁও ও ফরিদাবাদের মতো নব্য আধুনিক শহরগুলোতে গড়ে ওঠা আইটি হাব, বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় নতুন প্রজন্মের লক্ষাধিক বাঙালি পেশাজীবী কর্মরত। এই উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক বাঙালি তরুণ সমাজ জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গতিশীলতার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

সুদীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দিল্লির বুকে বসবাসকারী বাঙালি সমাজ তাদের ভাষাগত শিকড়, সাহিত্য ও শিল্প ঐতিহ্যকে পরম মমতায় ধরে রেখেছে, আবার একই সাথে রাজধানীর শাসনতান্ত্রিক ও বহুমুখী নাগরিক সংস্কৃতির সাথে আত্মীকৃত হয়েছে। কাশ্মীরি গেটের শতবর্ষী দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে সিআর পার্কের শারদোৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী, বইমেলা এবং বিভিন্ন নাটক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, দিল্লি আজ কেবল ভারতের রাজনৈতিক রাজধানী নয়; তা উত্তর ভারতের বুকে বঙ্গীয় প্রজ্ঞা, ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবনবোধের এক অবিনশ্বর কেন্দ্রবিন্দু।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।