খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৪:২০ পিএম

বাংলা কবিতার ইতিহাসে নিজস্ব দীপ্তি ছড়িয়ে যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত ও আলোকিত করে চলেছেন, তিনি কবি নির্মলেন্দু গুণ। প্রেম, দ্রোহ, গণমানুষের অধিকার, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা—এসবই তাঁর কাব্যের প্রধান উপজীব্য। সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘লোক’ তাঁকে যথার্থভাবেই ‘পোয়েট অব বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তাঁর কবিতায় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যেন একাকার হয়ে উঠেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি
১৯৪৫ সালের ২১ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী, যিনি সাহিত্যাঙ্গনে নির্মলেন্দু গুণ নামেই সমধিক পরিচিত। তাঁর পিতা সুখেন্দু প্রকাশ গুণ এবং মাতা বীণাপাণি দেবী। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মাত্র চার বছর বয়সে মাতৃহারা হওয়ার পর সৎমাতা চারুবালার স্নেহে তাঁর প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয়।
শিক্ষাজীবন ও সাহিত্যের সূচনা
শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নেত্রকোণার প্রাকৃতিক সান্নিধ্যে। বারহাট্টার করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৬২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ছাত্রজীবনেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পূর্বেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় তাঁর জীবনের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯৬৪ সালের আইএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে প্রথম বিভাগপ্রাপ্ত ১১৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নেত্রকোণা কলেজের একমাত্র ছাত্র ছিলেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলেও তৎকালীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তাঁর সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
রাজনৈতিক চেতনা ও সাংবাদিকতা
ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তির সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর কাব্যচেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংবাদপত্রে তিনি সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও চলচ্চিত্রায়ণ
১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, যা বাংলা কবিতার জগতে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত ‘হুলিয়া’ কবিতাটি তাঁকে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা এনে দেয়। পরবর্তীকালে এই কবিতার মূল ভাব অবলম্বনে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল একটি পরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র ‘হুলিয়া’ নির্মাণ করেন। এছাড়া তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘দেশান্তর’ অবলম্বনে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যা দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ
তাঁর অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ বাংলাদেশের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার এক অনন্য দলিল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একইসঙ্গে ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ প্রভৃতি কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। কবিতার পাশাপাশি তিনি গদ্য, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি ও উপন্যাস রচনাতেও সমান পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচনায় নারীপ্রেম, শ্রেণি-সংগ্রাম, মানবিক বোধ, সামাজিক বৈষম্য এবং স্বৈরাচারবিরোধী চেতনা শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য ও নিরলস অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি নির্মলেন্দু গুণ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত প্রধান প্রধান পুরস্কারগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| পুরস্কারের নাম | প্রদানের বছর | বিবরণ ও গুরুত্ব |
| বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার | ১৯৮২ | সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। |
| একুশে পদক | ২০০১ | ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক। |
| স্বাধীনতা পুরস্কার | ২০১৬ | সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। |
| আজীবন সম্মাননা | সাম্প্রতিক | দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা এবং বাংলা কবিতায় অনন্য অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা। |
কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা যেমন এদেশের মানুষের বিবেককে জাগ্রত করেছে, তেমনি তা আগামী প্রজন্মের মননকেও আলোকিত করে চলেছে। মানুষের অধিকার ও প্রতিবাদের চিরন্তন বাণী ধারণ করে তাঁর কলম বাংলা সাহিত্যকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে।
মন্তব্য