,

কক্সবাজারে ডেঙ্গু বাড়ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছয় মৃত্যু

কক্সবাজারে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ৩ হাজার ৮৫৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ২ হাজার ৫০৭ জনই রোহিঙ্গা। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন, যাঁদের সবাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে টেকনাফে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলাটিতে ৩৩২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৯৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মহেশখালীতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সেখানে ২৬৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে এবং ২৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চকরিয়ায় ২৬১ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৫৯ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। উখিয়ায় ১৯৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ১৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জেলার অন্যান্য এলাকাতেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৯৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে এবং ৯৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঈদগাঁওয়ে ৫৮ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। রামুতে ৫৩ জন, পেকুয়ায় ১৪ জন এবং কুতুবদিয়ায় ১৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভা এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ জন। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য এলাকা থেকে আরও ৪৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২ জন আছেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে। মহেশখালীতে চারজন, টেকনাফে তিনজন, চকরিয়ায় তিনজন, উখিয়ায় দুজন এবং পেকুয়ায় একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি আলাদাভাবে নজরে এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে ২ হাজার ৫০৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৫০৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে এক সপ্তাহে ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে আরও ১৩৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের প্রধান স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা মো. রিজুয়ানুল হক ভূঁইঞা জানান, ক্যাম্পগুলোর মোট জনসংখ্যার তুলনায় পাঁচটি ক্যাম্পে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি। নয়াপাড়া আরসি ক্যাম্পে আক্রান্তের হার ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। ক্যাম্প-১৪-তে এই হার ০ দশমিক ৮১ শতাংশ, ক্যাম্প-২৬-এ ০ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ক্যাম্প-১৯-এ ০ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনে ০ দশমিক ১২ শতাংশ।

ডা. আবু তোহা মো. রিজুয়ানুল হক ভূঁইঞা বলেন, ক্যাম্পগুলোর ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বর্ষার সময় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শেষের দিকে এলেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গুর বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ উখিয়ায় বসবাস করে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। এর ফলে ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বেশি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আকতার বলেন, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। এ রোগের বিস্তার কমাতে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি রোগটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। তাঁর মতে, সচেতনতা বাড়লে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমানোর পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব।

কক্সবাজারের বর্তমান চিত্রে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভিন্ন উপজেলায় রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তবে মোট আক্রান্তের বড় অংশ রোহিঙ্গা হওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পানি জমে থাকা, নিষ্কাশনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা রোগের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া অব্যাহত থাকায় বর্ষা-পরবর্তী সময়েও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।