খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুলাই ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে নির্মিত দেশের অকুতোভয় সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও তাঁর আবক্ষ ভাস্কর্য ভাঙার কাজ স্থগিত করেছে জেলা প্রশাসন। এই চত্বরটি ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া নিয়ে গত ১৬ জুলাই গণমাধ্যমে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এর পরিপ্রক্ষিতে গতকাল শনিবার থেকে ভাঙার কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৩ জুলাই থেকে প্রকাশ্যেই চত্বরটি ভাঙার কাজ চলছিল। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কার নির্দেশে বা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে এই ভাঙার কাজ করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের দায়িত্বশীল কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ১৭ জুলাই পর্যন্ত শ্রমিকরা প্রকাশ্য দিবালোকে চত্বরটি ভাঙলেও কারা এবং কেন এই ধ্বংসাত্মক কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় কোনো সংস্থাই কোনো ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি।
এই বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানান:
“সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার আগে আমি জানতামই না যে এটি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের চত্বর কিংবা ভাস্কর্য। এর আকার-আকৃতি দেখেও বিষয়টি বোঝার কোনো উপায় ছিল না। চত্বরটির নির্মাণকাজ শুরুর পরপরই স্থানীয় মানুষের আপত্তির মুখে কাজ স্থগিত রাখা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছি। তবে ভাস্কর্যটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের, তা নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙার কাজ স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছি।”
এই বিষয়ে আগে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না কিংবা কারা ভাঙছিল তা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক স্পষ্ট জানান, তিনি অতীতের কোনো বিতর্কে জড়াতে চান না এবং এই বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং তিনি গোটা দেশের গর্ব। তাই নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি উপযুক্ত স্থানে যথাযথ মর্যাদায় তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।
এদিকে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান জানান, চত্বরটি অপসারণ বা ভাঙার আগে তাঁর দপ্তরের সঙ্গে কেউ কোনো যোগাযোগ করেনি। তিনি তথ্য দেন যে, ২০১৯ সালে জেলা পরিষদ ও ঝিনাইদহ পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে এই জায়গায় চত্বরটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কাজও শুরু হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, এই জায়গাটি চলমান ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়নকাজের আওতায় পড়ে গেছে।
অন্যদিকে ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান বলেন, গতকাল থেকে ভাঙার কাজ বন্ধ রয়েছে ঠিকই, তবে ঝিনাইদহ পৌরসভা এই ভাঙার কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়। কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। তবে কারা এই চত্বরটি ভাঙছিল, তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন এই ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়, তখন ঝিনাইদহ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আমাদের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমরা সশরীরে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। এটি আমার চাচা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য। এটিকে এভাবে ভেঙে ফেলা একটি অত্যন্ত অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক কাজ। পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের দাবি, যথাযথ মর্যাদায় ভাস্কর্যটি সংস্কার করে একই স্থানে যেন পুনঃস্থাপন করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের শহরের প্রবেশমুখে এই চত্বরটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিল ঝিনাইদহ পৌরসভা। চত্বরটিতে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি বিমূর্ত আবক্ষ ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাতের একটি সিমেন্টের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, চত্বরটি অতিরিক্ত উঁচু হওয়ায় এই চারমুখী মোড়ে যান চলাচলে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। সেই কারণে একপর্যায়ে নির্মাণকাজ শেষ না করেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চত্বরটি অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
মন্তব্য