বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ক্রমেই চাপে পড়ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী টাইমের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানির বাড়তি মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে বাংলাদেশে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ডিজেলের মূল্য বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে। বিশেষ করে বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ, কাপড় রং করা, ধোয়া ও পোশাক তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। জ্বালানি সংকটে উৎপাদনের এসব ধাপ ব্যাহত হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতাও দায়ী। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। এসব কারণে জুলাই ও আগস্টে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানির এই ঘাটতি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার বিভিন্ন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটছে।
এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন সচল রাখতে অনেক পোশাক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলের বাড়তি দাম উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিকে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ব্যয়বৃদ্ধি—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী টাইমকে জানান, বাংলাদেশে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটে। নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে গ্যাসের পর ডিজেলই সবচেয়ে কার্যকর জ্বালানি। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে।
হা-মীম গ্রুপে প্রায় ৯০ হাজার কর্মী কাজ করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতি মাসে প্রায় ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি হয়। গ্যাপ, আমেরিকান ঈগল ও জেসি পেনির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম ক্রেতা।
বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা রেখেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হা-মীম গ্রুপের কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে দিনরাত চালু থাকা কারখানায় সৌরবিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
জ্বালানি সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় দুই লাখ ডলার থেকে বেড়ে তিন লাখ ডলারে পৌঁছেছে বলেও টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজে পোশাকের ক্রয়মূল্য বাড়াতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে হা-মীম গ্রুপ।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই শিল্প থেকে। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এ খাতে। এর বাইরে পরিবহন, প্যাকেজিং, সুতা, কাপড়, আনুষঙ্গিক উপকরণ ও অন্যান্য সহযোগী শিল্পের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকাও পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু রপ্তানি আয়ই নয়, কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জ্বালানি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে পারলেও তুলনামূলক ছোট কারখানাগুলোর পক্ষে সেই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন।
এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও পড়ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ শিগগিরই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ফলে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং খাদ্যনিরাপত্তাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত নতুন জ্বালানি রূপরেখায় সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে মোট ৩০০টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি কূপ খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে টাইমের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
তিনি বলেন, নতুন পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁর প্রত্যাশা, পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ সংকটের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে।
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান টাইমকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি অনেক ভালো থাকত।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে নির্ধারিত সময়ে পোশাক সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটির স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।









