ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের নিউজের বরাতে জানা গেছে, মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে সেগুলোর কার্যকারিতা, নির্ভুলতা ও আঘাত হানার পাল্লাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তাঁর দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র এমনভাবে উন্নত করা হয়েছে, যাতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসম্পন্ন মার্কিন যুদ্ধজাহাজও হামলার আওতার বাইরে থাকতে না পারে। তবে ইরানের এই সামরিক সক্ষমতার দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো পরীক্ষার ফলাফল বা বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই আইআরজিসির শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য এল। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। ওই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উপসাগরীয় আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের সাহায্যে পাল্টা আক্রমণ চালায়।
এসব হামলার ফলে আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না করার কথা উল্লেখ করে মূল প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের ধারাবাহিক ও শক্তিশালী হামলায় কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমনকি কিছু স্থাপনার বড় অংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার দাবিও করা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে সরাসরি সক্রিয় সামরিক সংঘাত আপাতত বন্ধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। মূল প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ইরানি বন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ বহাল রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অবরোধ প্রত্যাহার না করা হলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে সরাসরি হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই জলপথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নৌচলাচলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দুই দেশের এই বিপরীত অবস্থানই সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধের অন্যতম কারণ।
মূল প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং তেহরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলের চেষ্টা করা বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌযান হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সব ধরনের নৌযানের জন্য এমন অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কি না এবং হামলার ঘটনাগুলোর বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সামরিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানার সক্ষমতা এবং বাস্তবে কোনো যুদ্ধজাহাজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করে সফল হামলা পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। ক্ষেপণাস্ত্রের গতি, লক্ষ্য শনাক্ত করার প্রযুক্তি, প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর হামলার কার্যকারিতা নির্ভর করে।
এমন পরিস্থিতিতে আইআরজিসির উপপ্রধানের বক্তব্যকে ইরানের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।









