মধ্য ইউরোপের দেশ জার্মানিতে জেঁকে বসা তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মাঝে নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে শক্তিশালী তুষারঝড় ‘এল্লি’। গত কয়েক দিন ধরে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা বরফের চাদরে ঢাকা থাকলেও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সপ্তাহান্তের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ‘স্টুর্ম ডের স্পিগেল’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ আদ্রিয়ান লাইজার জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোর থেকে একটি গভীর নিম্নচাপ সরাসরি জার্মানির উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানবে, যা বয়ে আনবে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত ও প্রবল ঝোড়ো হাওয়া।
আঞ্চলিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রভাব
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঝড়ের সর্বোচ্চ প্রভাব পড়বে জার্মানির উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। উত্তর সাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নতুন তুষার জমতে পারে। ঝোড়ো বাতাসের কারণে তুষার স্তূপাকার হয়ে রাস্তা ও ফুটপাত চলাচলের অনুপযোগী করে তুলবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস প্রবেশ করলেও সেখানে ‘ফ্রিজিং রেইন’ বা জমাটবদ্ধ বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হয়ে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
নিচে তুষারঝড় ‘এল্লি’র প্রভাব ও জরুরি সতর্কতার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
তুষারঝড় ‘এল্লি’ ও জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতি
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও পূর্বাভাস |
| ঝড়ের নাম | এল্লি (Elli)। |
| তুষারপাতের মাত্রা | গড়ে ১০ সেমি, সর্বোচ্চ ২০ সেমি পর্যন্ত। |
| সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল | জার্মানির উত্তরাঞ্চল ও উত্তর সাগর উপকূলীয় এলাকা। |
| পরিবহন ব্যবস্থা | রেল চলাচলে বিঘ্ন, উচ্চগতির ট্রেনের গতি সীমিতকরণ। |
| স্বাস্থ্য ঝুঁকি | পিচ্ছিল রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি। |
| জননিরাপত্তা | হামবুর্গের কবরস্থান বন্ধ ও দাফন অনুষ্ঠান স্থগিত। |
| বিশেষ পরামর্শ | উপকূলীয় বাসিন্দাদের ৩ দিনের খাদ্য মজুতের আহ্বান। |
হাসপাতালে জরুরি রোগীর ভিড় ও জনবল সংকট
শীতকালীন এই দুর্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থায়। জার্মান হাসপাতাল সমিতির (ডিকেজি) প্রধান জেরাল্ড গাস জানান, বরফে ঢাকা পিচ্ছিল রাস্তায় আছাড় খেয়ে কবজি, কোমর, কাঁধ ও মাথায় গুরুতর চোট নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জার্মানির হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে বর্তমানে তিল ধারণের জায়গা নেই। একদিকে জনবল সংকট, অন্যদিকে রোগীর এই বাড়তি চাপ সামলাতে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসকরা বয়স্ক নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার জন্য কঠোর পরামর্শ দিয়েছেন।
যোগাযোগ ও সামাজিক কার্যক্রমে স্থবিরতা
জার্মান রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। বরফ জমার আশঙ্কায় উচ্চগতির ট্রেনগুলো ধীরগতিতে চালানো হচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকায় হামবুর্গের সকল কবরস্থান সোমবার সকাল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং পরিকল্পিত শোকানুষ্ঠানগুলো বাতিল করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশটির অনেক স্কুল ইতোমধ্যে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষ সতর্কতা ও মানবিক আবেদন
আবহাওয়াবিদরা উত্তরের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের আগামী কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বার্লিন সিটি মিশনের পক্ষ থেকে একটি মানবিক আবেদন জানানো হয়েছে। তীব্র ঠান্ডায় রাস্তায় থাকা গৃহহীন মানুষের প্রতি সদয় হতে এবং কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়লে অবিলম্বে সহায়তা করার জন্য নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে। রোববার নাগাদ তুষারঝড়ের তীব্রতা কমে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
