জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের বীমার স্থায়িত্ব সংকট

আজ জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদী ভাঙন এবং জলাবদ্ধতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে—তার মাত্রা ও ঘনত্ব উভয়ই বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বীমা খাতের জন্য ঝুঁকি নিরূপণ ও আর্থিক প্রস্তুতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ঝুঁকিগুলো এখন পূর্বাভাস করা কঠিন, তাই প্রশ্ন উঠছে—আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা কি এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম?

বীমার মূল ভিত্তি হলো ঝুঁকি ভাগাভাগি, যা পূর্বনির্ধারিত ঝুঁকির উপর নির্ভরশীল। নানাবিধ গ্রাহকের প্রিমিয়াম একত্রিত করে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার ধারণা বীমার মূলনীতি। তবে, জলবায়ু পরিবর্তন এই পূর্বনির্ধারিত ঝুঁকির ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে। দুর্যোগগুলো এখন পরিচিত ঋতুচক্র অনুসরণ করে না, ফলে ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রিমিয়াম নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব হলো বীমার সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়িতা কমে যাওয়া, যার ফলে বিশেষ করে দারিদ্রসীমার মানুষরা আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশ হিসেবে, এখানে বন্যা, প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় ঢেউ বারবার কৃষি, আবাসন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে। অথচ বীমার বিস্তার সীমিত। দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন প্রায়শই ব্যক্তিগত সঞ্চয়, ঋণ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যা পুনরুদ্ধারের সময় দীর্ঘায়িত করে এবং দারিদ্র্য চক্রকে আরও গভীর করে।

বাংলাদেশের বীমা খাতের সামনে দুইটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একদিকে উচ্চ ও অস্থিতিশীল ঝুঁকি, অন্যদিকে নাগরিকদের প্রিমিয়াম দেওয়ার সীমিত সক্ষমতা। প্রচলিত বীমা মডেল এই পরিস্থিতিতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রকৃত ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করলে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহনযোগ্য নাও হতে পারে, ফলে সামাজিক সুরক্ষা সঠিকভাবে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা অপরিহার্য। কেবল বাজারে ছেড়ে দিলে সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠী বীমার বাইরে থেকে যাবে, আর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং বীমা নীতি একসাথে পরিকল্পনা করা। ঝুঁকি হ্রাসমূলক কার্যক্রমকে উদ্ভাবনী বীমা স্কিমের সঙ্গে যুক্ত করলে আর্থিক নিরাপত্তা জালে দৃঢ়তা আসবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বীমা আর কেবল আর্থিক পণ্য নয়; এটি জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সর্বব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বীমা ছাড়া একই সম্প্রদায় বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বাস্তবতা মোকাবিলায় প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, সৃজনশীল বীমা সমাধান এবং জলবায়ু ঝুঁকিভিত্তিক সমন্বিত আর্থিক পরিকল্পনা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর