মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে কেবল আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠ বা জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে তা নয়; এর প্রভাব এখন ধরা পড়ছে পৃথিবীর মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্যেও। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং এর ফলে দিনগুলোর দৈর্ঘ্য ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গবেষকেরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া এবং পৃথিবীর ভরের বণ্টনে পরিবর্তন।
গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ইউরোপের দুই শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা অংশ নেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৩ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। গত প্রায় ৩৬ লাখ বছরের ইতিহাসে এই পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত আর কখনো দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফস্তর ও হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এই গলিত পানি ধীরে ধীরে বিষুবরেখা অঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পৃথিবীর ভর অক্ষের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভরের এই পুনর্বণ্টনের কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ছে।
এই ঘটনাকে সহজভাবে বোঝাতে গবেষকেরা একজন নৃত্যশিল্পীর উদাহরণ দিয়েছেন। একজন নৃত্যশিল্পী যখন হাত শরীরের কাছে রেখে ঘোরেন তখন তিনি দ্রুত ঘুরতে পারেন। কিন্তু যখন হাত দুটো ছড়িয়ে দেন তখন ঘূর্ণনগতি কমে যায়। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভৌত প্রক্রিয়া ঘটছে। বরফ গলে সৃষ্ট পানি পৃথিবীর অক্ষ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় গ্রহটির ঘূর্ণনগতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক বেনেডিক্ট সোজা জানিয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে নানা সময় প্রাকৃতিক কারণে দিনের দৈর্ঘ্যে ওঠানামা ঘটেছে। তবে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যে পরিবর্তনের গতি দেখা গেছে, তা জলবায়ু ইতিহাসে একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রায় ২০ লাখ বছর আগে দিনের দৈর্ঘ্যে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো দ্রুতগতির পরিবর্তন তখনও দেখা যায়নি।
যদিও এক মিলিসেকেন্ড মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খুব ক্ষুদ্র সময় মনে হতে পারে, তবু আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ আজকের বিশ্বে বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সময় গণনার ওপর নির্ভরশীল।
নিচের সারণিতে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের বর্তমান ও সম্ভাব্য প্রবণতা তুলে ধরা হলো—
| সময়কাল | দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির হার | প্রধান কারণ |
|---|---|---|
| গত ৩৬ লাখ বছরের গড় পরিবর্তন | তুলনামূলক ধীর | প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র |
| বর্তমান সময় | প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ১.৩৩ মিলিসেকেন্ড | বরফ গলন ও ভরের পুনর্বণ্টন |
| সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ (২১ শতকের শেষভাগ) | প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ২.৬২ মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত | ত্বরান্বিত জলবায়ু পরিবর্তন |
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্র সময় পরিবর্তন মহাকাশ প্রযুক্তি, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক সময় ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মহাকাশযানের গতিপথ নির্ধারণে মিলিসেকেন্ডের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থার নির্ভুলতা নির্ভর করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সময় পরিমাপের ওপর।
এছাড়া বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত পারমাণবিক ঘড়িগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সময় নির্ধারণ করে। পৃথিবীর ঘূর্ণনগতির পরিবর্তন এই সময় ব্যবস্থার সমন্বয়কে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পৃথিবীর অতীত ইতিহাস বোঝার জন্য গবেষকেরা সমুদ্রতলের প্রাচীন জীবাশ্মও বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে বেন্থিক ফোরামিনিফেরা নামের এককোষী সামুদ্রিক জীবের জীবাশ্মের রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করে অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। সেই তথ্য ব্যবহার করে উন্নত গণনামূলক পদ্ধতিতে কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন নির্ণয় করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে যখন গ্রিনল্যান্ড অঞ্চল বরফে আচ্ছাদিত ছিল না এবং সেখানে বনভূমি ছিল, তখনও পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ের দ্রুত পরিবর্তনের তুলনায় সেই পরিবর্তন অনেক ধীর ছিল।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে এই শতাব্দীর শেষভাগে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক জোয়ারভাটার প্রভাবের চেয়েও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বড় ভূমিকা নিতে পারে। এতে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
