নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে সহকর্মী আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সেদিন আদালতে কোনো স্লোগান দেননি।
বুধবার ভোররাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের আল্লামা ইকবাল রোড ও দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের নিজ নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান তুষার এবং জিয়াউল ইসলাম কাজলের ভাই আতিকুল ইসলাম। মাহবুবুর রহমান তুষার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আসাদুজ্জামানের ছেলে।
যে অভিযোগে গ্রেপ্তার
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যান সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওই সময় আদালত প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ওই মামলার এজাহারে তাঁদের নাম নেই। তবে তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জামিন পেয়েছেন আইভী
এর আগে মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তুহিন হত্যা মামলায় সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। ওই মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। মঙ্গলবার সকালে তিনি সশরীরে আদালতে হাজির হন। শুনানি পরিচালনা করেন নারায়ণগঞ্জের দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আবু শামীম আজাদ।
জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি আইভী। তবে গাড়িতে ওঠার আগে তিনি বলেন, “জয় বাংলাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।”
আইভীর এই বক্তব্য এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে আইভীর জামিনের বিষয়টি এবং তিনজনের গ্রেপ্তার একই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়; গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায়।
গ্রেপ্তার নিয়ে আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের আপত্তি
জিয়াউল ইসলাম কাজল ও মাহবুবুর রহমান তুষারের সহকর্মী আইনজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, দুজনই সাবেক মেয়র আইভীর অন্যতম আইনজীবী হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের হাতে মামলার নথিপত্রও ছিল। ওই সময় তাঁরা কোনো স্লোগান দেননি বলে দাবি করেছেন সহকর্মীরা।
জিয়াউল ইসলাম কাজল নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তিনি আবৃত্তিশিল্পী এবং নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি। শহরের আলোচিত কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ওই সময়ে সাংস্কৃতিক জোট ছাত্র-জনতার পক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল বলে সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি বলেন, জিয়াউল ইসলাম কাজল দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। খুন, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।
রফিউর রাব্বির অভিযোগ, কাজলকে গ্রেপ্তারের পক্ষে পুলিশ যে যুক্তি দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এ গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় কাজল সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হিসেবে ছাত্র-জনতার পক্ষে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।
তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তারের কথা পুলিশের
গ্রেপ্তারের বিষয়ে সমালোচনার জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, কারও অতীতের অবস্থান ও বর্তমান অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। তদন্তের স্বার্থেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের বক্তব্য এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সহকর্মীদের দাবির মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। পুলিশের দাবি, পুরোনো মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সহকর্মীদের বক্তব্য হলো, তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং কোনো স্লোগান দেননি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা, তাঁদের কথিত সংশ্লিষ্টতা এবং পুরোনো মামলায় তাঁদের ভূমিকা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।









