চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের লক্ষ্যে এমিরেটসে আর্সেনাল-অ্যাতলেতিকো দ্বৈরথ

ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার চূড়ান্ত লড়াইয়ে আজ লন্ডনের এমিরেটস স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে আর্সেনাল এবং অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ। সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি আজ দিবাগত রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হবে। গত সপ্তাহে স্পেনের ওয়ান্দা মেট্রোপলিটানো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম লেগের ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হওয়ায় আজকের ম্যাচটি দুই দলের জন্যই ‘অঘোষিত ফাইনাল’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই দ্বৈরথের বিজয়ী দল হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিতব্য কাঙ্ক্ষিত ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে।

প্রথম লেগের ঘটনাবহুল প্রেক্ষাপট

স্পেনের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম লেগে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল দুই অর্ধে প্রাপ্ত দুটি পেনাল্টি গোলের মাধ্যমে। অ্যাতলেতিকোর পক্ষে গোল করেছিলেন ভিক্টর গায়োকেরেস এবং আর্সেনালের পক্ষে সমতা ফিরিয়েছিলেন হুলিয়ান আলভারেজ। তবে ম্যাচের শেষ দিকে একটি নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি হয় যখন এবারিচি এজে এবং ডেভিড হাঙ্কোর মধ্যকার একটি শারীরিক সংঘর্ষের পর ভিএআর (VAR) রিভিউতে আর্সেনালের অনুকূলে দেওয়া একটি পেনাল্টি বাতিল করে দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আর্সেনাল ম্যানেজার মিকেল আর্তেতা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মাঠের সেই উত্তাপ আজ এমিরেটসের গ্যালারিতেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের হাতছানি

আর্সেনাল দীর্ঘ ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। গানাররা চলতি চ্যাম্পিয়নস লিগ মৌসুমে এখন পর্যন্ত অপরাজিত। আজকের ম্যাচে তারা যদি হার এড়াতে পারে, তবে টানা ১৪ ম্যাচে অপরাজিত থাকার একটি নতুন ক্লাব রেকর্ড গড়ে ইতিহাস লিখবে তারা। ঘরের মাঠে স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে আর্সেনালের পরিসংখ্যান বেশ ঈর্ষণীয়। লন্ডনের এই মাঠে গত ১৫টি ম্যাচে স্প্যানিশ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গানাররা মাত্র একবার হারের মুখ দেখেছে। এছাড়া গ্রুপ পর্বে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে হারিয়ে দেওয়ার সাম্প্রতিক স্মৃতিও আর্সেনাল সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।

অ্যাতলেতিকোর রণকৌশল ও সিমিওনে ফ্যাক্টর

অন্যদিকে, ডিয়েগো সিমিওনের প্রশিক্ষণাধীন অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ এই ম্যাচে অংশ নিচ্ছে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে। লা লিগার সর্বশেষ ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে তারা তাদের মূল একাদশের ১১ জন খেলোয়াড়কেই পরিবর্তন করে মাঠে নামিয়েছিল, তবুও ২-০ গোলে জয় নিশ্চিত করে তারা। সিমিওনে তার দলের প্রধান ফুটবলারদের প্রায় ছয় দিনের পূর্ণ বিশ্রাম দিয়ে সতেজ রেখেছেন, যা এমিরেটসের উচ্চগতির ম্যাচে গানারদের চাপে ফেলতে পারে। চলতি মৌসুমে কোপা দেল রে-র ফাইনালে হারের তিক্ততা ভুলে অ্যাতলেতিকোর জন্য চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপাই এখন একমাত্র লক্ষ্য।

খেলোয়াড়দের চোট ও স্কোয়াড আপডেট

আর্সেনাল শিবিরে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড এবং ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টজকে নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। ওডেগার্ড হাঁটুর ইনজুরি এবং হাভার্টজ পেশির টানে ভুগছেন। তবে দলের মেডিকেল টিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা ফিটনেস টেস্টে উত্তীর্ণ হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইউরিয়েন টিম্বার এবং মিকেল মেরিনো চোটের কারণে নিশ্চিতভাবেই মাঠের বাইরে থাকছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে পিয়েরো হিনকাপি এবং মার্টিন জুবিমেন্ডিকে শুরু থেকেই একাদশে দেখা যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

অ্যাতলেতিকো শিবিরে খুশির খবর হচ্ছে, প্রথম লেগে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া হুলিয়ান আলভারেজ এখন পুরোপুরি সুস্থ। আলভারেজ প্রথম লেগেই ফুটবল সম্রাট লিওনেল মেসির একটি অনন্য রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে দ্রুততম আর্জেন্টাইন হিসেবে ২৫ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। মেসি ৪২ ম্যাচে এই অর্জন পূর্ণ করলেও আলভারেজ তা করেছেন মাত্র ৪১ ম্যাচে। রক্ষণভাগে হোসে হিমেনেজকে নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও অ্যাতলেতিকো তাদের শক্তিশালী আক্রমণভাগ নিয়েই মাঠে নামবে। তবে পাবলো ব্যারিওস এবং নিকো গঞ্জালেস ইনজুরির কারণে স্কোয়াডের বাইরে থাকছেন।

ম্যাচের কৌশলগত গুরুত্ব

আজকের ম্যাচে আর্সেনাল চাইবে তাদের চিরাচরিত বল পজেশন ভিত্তিক ফুটবল খেলে শুরুতেই লিড নিতে। অন্যদিকে সিমিওনের দল তাদের পরিচিত রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবলের ওপর ভর করে গানারদের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করবে। অ্যাতলেতিকোর জন্য অ্যাওয়ে গোল বা সমতা বজায় রেখে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়াও একটি কৌশল হতে পারে। তবে এমিরেটসের গ্যালারিতে থাকা আর্সেনাল সমর্থকদের প্রবল চাপ মোকাবিলা করা মাদ্রিদের দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

দুই দশক পর আর্সেনাল কি পারবে তাদের ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যেতে? নাকি সিমিওনের ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাসে আরও একবার চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নিতে হবে গানারদের? এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজ রাতের ৯০ মিনিটের ফুটবল যুদ্ধে। বুদাপেস্টের ফাইনাল যারাই নিশ্চিত করুক না কেন, আজকের ম্যাচটি বিশ্ব ফুটবল প্রেমীদের জন্য একটি ধ্রুপদী লড়াই হতে যাচ্ছে।