দেশের আর্থিক খাতে গতিশীলতা আনা এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করতে ব্যক্তিগত ঋণ ও মোটরযান ঋণের (অটো লোন) সীমা পুনর্নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনায় হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) কেনার ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
Table of Contents
মোটরযান ঋণের নতুন বিন্যাস ও সীমা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গ্রাহকদের মোটরযান কেনার সুবিধার্থে ঋণের ঊর্ধ্বসীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে গাড়ির বাজারমূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোটরযান ঋণের নতুন কাঠামো নিচে তুলে ধরা হলো:
হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি: পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে একজন গ্রাহক এখন থেকে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।
প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ি: পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেলচালিত সাধারণ ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট এবং দেশে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহনের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রাহকদের এই প্রযুক্তির দিকে আকৃষ্ট করতেই ঋণের সীমায় এই বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত (Debt-Equity Ratio)
ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ প্রদানের অনুপাতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহককে বড় অংকের নিজস্ব বিনিয়োগ করতে হতো, যা এখন অনেক শিথিল করা হয়েছে:
১. বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি: এই শ্রেণির গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণ ও নিজস্ব বিনিয়োগের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০:২০। অর্থাৎ, গাড়ির মোট মূল্যের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে এবং গ্রাহককে মাত্র ২০ শতাংশ অর্থ নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দিতে হবে। ২. সাধারণ গাড়ি: প্রচলিত জ্বালানির গাড়ির ক্ষেত্রে এই অনুপাত রাখা হয়েছে ৬০:৪০। অর্থাৎ, ব্যাংক সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করবে এবং বাকি ৪০ শতাংশ গ্রাহককে বহন করতে হবে।
ব্যক্তিগত ঋণের (Personal Loan) সীমা দ্বিগুণ
গাড়ি কেনার ঋণের পাশাপাশি সাধারণ ব্যক্তিগত ঋণের সীমাও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে একজন গ্রাহক ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যক্তিগত ঋণ নিতে পারতেন। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সীমা বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত ঋণের এই ঊর্ধ্বসীমা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নির্ভরশীলদের ঋণের হিসাব ও এক্সপোজার লিমিট
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ শর্তারোপ করেছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ঋণের মোট ‘এক্সপোজার’ বা সীমা নির্ধারণের সময় তার ওপর নির্ভরশীল সদস্যগণ (যেমন: স্ত্রী, সন্তান বা অন্য নির্ভরশীল সদস্য) যদি ব্যাংক থেকে অটো লোন বা অন্য কোনো ঋণ গ্রহণ করে থাকেন, তবে সেটিও মূল আবেদনকারীর মোট ঋণসীমার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে এক পরিবারে ঋণের কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্য এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলার সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে তুলনামূলক কম শুল্ক সুবিধা এবং এখন ব্যাংক ঋণের বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় এই খাতের বাজারে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, দেশের অটোমোবাইল শিল্পের বিবর্তন এবং গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রাখতেই এই নীতিগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনা জারির তারিখ অর্থাৎ ৫ মে ২০২৬ থেকেই তা কার্যকর বলে গণ্য হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অবিলম্বে এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাদের অভ্যন্তরীণ ঋণ নীতিমালা হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে পরিবেশবাদী উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক সাড়া পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
