বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্বায়ত্তশাসন এবং একাডেমিক স্বাধীনতার প্রশ্নে সরকারের ইতিবাচক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
Table of Contents
স্বাধীনতা বনাম নিয়ন্ত্রণ: সরকারের নীতিগত অবস্থান
শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ ও স্বাধীনতা দিতে ইচ্ছুক, তবে সেই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ না হয়। তিনি হলি আর্টিজানের মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, অতীতে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জঙ্গিবাদের প্রজনন ক্ষেত্রে বা ‘জঙ্গি কারখানায়’ পরিণত হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা সরকারের জন্য অপরিহার্য।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীনতা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা তদারকির বাইরে থাকবে। দেশের আইন ও নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সরকার কঠোরভাবে ‘রেগুলেট’ বা নিয়ন্ত্রণ করবে। জাতীয় সংহতি ও সংহতি বিনষ্টকারী কোনো কর্মকাণ্ড যেন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশ্রয় না পায়, সে বিষয়ে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের আইনি বাধ্যবাধকতা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা বা মালিকরা নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অলাভজনক বলে দাবি করেন। তবে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোথায় ব্যয় হচ্ছে বা কোথায় স্থানান্তরিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য থাকে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার আড়ালে বাণিজ্যিক মনোবৃত্তি এবং অর্থের অস্বচ্ছ প্রবাহ বন্ধে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত অর্থ যেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির কাজেই ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর নিরীক্ষার ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী।
সমস্যা সমাধান ও প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী জানান যে, প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বিদ্যমান সমস্যাবলি সম্পর্কে অবগত এবং তিনি সেগুলো দ্রুত সমাধানের বিষয়ে আন্তরিক। মন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন যেন আমরা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনি এবং তা দ্রুত সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করি।” সরকার বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
শিক্ষা খাতের রূপান্তর: আন্তর্জাতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষামন্ত্রী এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদাহরণ টেনে আনেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শিক্ষা খাতের দ্রুত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যদি রাতারাতি তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ শিক্ষা খাত থেকে দেশের সবচেয়ে বেশি উপার্জন নিশ্চিত করতে পারে। এক্ষেত্রে বিদেশের সফল ও গুণগত মডেলে শিক্ষা ব্যবস্থা সাজানোর বা ‘ভালো উদাহরণ নকল করার’ পক্ষে মত দেন তিনি।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার প্রশংসা করে বলেন, জিয়াউর রহমান মাত্র ১৬ দিন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে যে পরিমাণ সংস্কারমূলক কাজ করেছেন, তা ১৬ বছরেও সম্পন্ন করা দুরূহ। এই ঐতিহাসিক কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকারকে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে কাজ করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত
পরিশেষে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি পুনরায় সতর্ক করে বলেন যে, শিক্ষার আড়ালে কোনো ধরনের দেশবিরোধী কার্যক্রম বা আর্থিক অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। সরকার যেমন উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বেসরকারি খাতকে সহায়তা প্রদান করবে, তেমনি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেও পিছপা হবে না। বনানীর এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
