দীর্ঘদিনের চোটের সঙ্গে লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের গতিময় পেসার মার্ক উড। বাঁ হাঁটুর গুরুতর সমস্যার কারণে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে ৩৬ বছর বয়সে তিন সংস্করণের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাচ্ছেন না। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ও ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে এই ইংলিশ পেসারের।
ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে উড জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে চোটের কারণে শারীরিক সমস্যায় ভোগার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর প্রায় ১১ বছরের ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন উড। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই চোট ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। হাঁটু, কনুইসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে একাধিকবার মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। প্রতিবারই পুনর্বাসন শেষে ফিরেছেন এবং বল হাতে নিজের বিশেষত্ব দেখিয়েছেন।
উডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর গতি। ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে নিয়মিত বোলিং করার সক্ষমতা তাঁকে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের জন্য বাড়তি হুমকি বানিয়েছিল। নতুন বলে সুইং করানোর পাশাপাশি শর্ট বল, বাউন্সার ও গতির পরিবর্তন কাজে লাগাতে পারতেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট নেওয়ার সামর্থ্যও ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে চোটের কারণে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলেও ইংল্যান্ডের বড় ম্যাচগুলোর পরিকল্পনায় তাঁকে প্রায়ই রাখা হয়েছে।
তিন সংস্করণেই ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন উড। ৩৮ টেস্টে তাঁর উইকেট ১১৯টি। ৭০ ওয়ানডেতে নিয়েছেন ৮০ উইকেট। আর ৩৮ টি-টোয়েন্টিতে তাঁর শিকার ৫৪ উইকেট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে তিন ফরম্যাটেই কার্যকর বোলার হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন তিনি।
উডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয়েছিল অভিষেকের বছরেই। ২০১৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজে ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জয়ের শেষ উইকেটটি নিয়েছিলেন তিনি। সেই সিরিজে ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতেই ঐতিহাসিক অ্যাশেজ সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উডের জন্য ছিল বিশেষ অর্জন।
এরপর ইংল্যান্ডের সাদা বলের ক্রিকেটেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী হন তিনি। ২০১৯ সালে ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ড দলের সদস্য ছিলেন উড। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলেও ছিলেন তিনি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দুটি বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ড দলের অংশ হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি চোটের সঙ্গে লড়াইও উডের ক্যারিয়ারের বড় পরিচয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি, তিন সংস্করণে খেলার শারীরিক চাপ এবং বারবার চোটে পড়ার কারণে তাঁকে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে পুনর্বাসন ও ফিটনেস ফিরে পাওয়ার কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাঁ হাঁটুর সমস্যা তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
বিদায়বেলায় নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য করেছেন উড। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, পরিসংখ্যান হয়তো তাঁকে সর্বকালের সেরা বোলারদের তালিকায় জায়গা দেবে না। কিন্তু তিনি চান সতীর্থরা তাঁকে এমন একজন ক্রিকেটার হিসেবে মনে রাখুক, যিনি মাঠে নামলে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাঁর সামনে এখন ভিন্ন ধরনের ক্রিকেটীয় পথ খোলা থাকছে। টেস্ট ও ওয়ানডের দীর্ঘ সূচির শারীরিক চাপ এড়িয়ে ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যেতে চান তিনি। বিশেষ করে আইপিএলের মতো প্রতিযোগিতায় তাঁর গতি ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও কাজে লাগতে পারে।
মার্ক উডের আন্তর্জাতিক বিদায়ে ইংল্যান্ডের পেস বোলিংয়ের একটি পরিচিত অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চোট তাঁকে অনেকবার থামিয়েছে, কিন্তু মাঠে ফিরলে তাঁর গতি ও আগ্রাসী বোলিং ছিল আলাদা আকর্ষণ। ৩৮ টেস্টে ১১৯, ৭০ ওয়ানডেতে ৮০ এবং ৩৮ টি-টোয়েন্টিতে ৫৪ উইকেট—এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দুটি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হওয়ার স্মৃতিও তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা বন্ধ হলেও মার্ক উডের ক্রিকেটযাত্রা এখনই শেষ হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের হয়ে তাঁর অধ্যায় শেষ হয়েছে, তবে ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে বল হাতে তাঁকে আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে।









