,

চীনা গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে ব্রিটিশ গবেষকদের সতর্কতা

যুক্তরাজ্যের শতাধিক শিক্ষাবিদ ও গবেষক অজান্তেই চীনের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি কথিত ‘ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রযুক্তি গবেষণায় সহযোগিতা করেছেন—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫। সংস্থাটির সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, গবেষকদের অনেকেই প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত না থাকায় স্বাভাবিক গবেষণা সহযোগিতা হিসেবেই ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

এমআই৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কাঠামোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত এমন কিছু গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করত, যেগুলো প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে সংবেদনশীল বলে বিবেচিত।

এর মধ্যে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, নিরাপদ বা গোপন যোগাযোগ এবং স্টেগানোগ্রাফি প্রযুক্তি। স্টেগানোগ্রাফি এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো দৃশ্যমান বার্তা বা ফাইলের ভেতরে অন্য তথ্য গোপন করা যায়। এই ধরনের প্রযুক্তির বেসামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি গোয়েন্দা ও সামরিক ক্ষেত্রেও প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ গবেষকই সৎ উদ্দেশ্যে এসব প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণা অর্থায়নের পেছনে চীনা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এমনভাবে আড়াল করা হয়েছিল যে অনেক গবেষকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না।

বিষয়টি সামনে আসার পর যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে তা ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এমআই৫ আরও সতর্ক করেছে, ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে সহযোগিতা করার অভিযোগ গুরুতর আইনি পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সতর্কবার্তা জারির পরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের গবেষণা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, অর্থায়ন ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে কাজ করে। ফলে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় বা উদ্দেশ্য গোপন থাকলে ঝুঁকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের ১৪০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে জানিয়েছে, তারা এমআই৫-এর সতর্কবার্তাটি পর্যালোচনা করছে এবং গবেষণা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

অন্যদিকে, লন্ডনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের ভাষ্য, এসব অভিযোগ ‘কাল্পনিক ও সম্পূর্ণ বানোয়াট’। তাদের দাবি, দুই দেশের মধ্যে শিক্ষাগত ও গবেষণা বিনিময় সব সময় আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মেনেই পরিচালিত হয়ে আসছে।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে ঘিরে যুক্তরাজ্য ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির গবেষণায় বেসামরিক ও নিরাপত্তাগত প্রয়োগের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। ফলে গবেষণা অর্থায়নের উৎস, অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং গবেষণার সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে যাচাই-বাছাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।