জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে আবারও বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ। পরিবহন ভাড়া থেকে কৃষির সেচ, পণ্য পরিবহন থেকে শিল্পের উৎপাদন—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর সেই প্রভাব দ্রুতই পরিবহন খাতে দেখা গেছে। তবে অক্টোবরের জন্য নতুন করে দাম বাড়ানো হয়নি; সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত দামই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে অক্টোবরজুড়ে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত সরবরাহ ও আমদানি ব্যয়ের চাপকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও (বিপিসি) সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় ও লোকসানের চাপে পড়ার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে দেশের বাজার সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের জায়গাটি অন্য। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ মোকাবিলায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ ভার কার ওপর পড়বে—এ প্রশ্নের উত্তর এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। পরিবহন, কৃষি ও শিল্পে ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ পণ্যের দাম, সেবা মূল্য কিংবা যাতায়াত খরচের মাধ্যমে ভোক্তার কাছেই পৌঁছায়।
বাসভাড়ায় তাৎক্ষণিক প্রভাব
জ্বালানির দাম বাড়ার পরপরই ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর নতুন কাঠামোয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। ডিটিসিএর আওতাধীন কয়েকটি এলাকাতেও ভাড়া ১৭ পয়সা করে বেড়েছে।
এটি চলতি বছরে বাসভাড়া সমন্বয়ের দ্বিতীয় বড় ঘটনা। এর আগে এপ্রিলেও ডিজেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তখন মহানগর এলাকায় ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং আন্তজেলা রুটে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়।
বাসের পাশাপাশি নৌপথের যাত্রী পরিবহনেও ভাড়া বেড়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব বিবেচনায় লঞ্চের ভাড়াও নতুন করে সমন্বয় করা হয়েছে।
পরিবহন ব্যয়ের এই বৃদ্ধি শুধু যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ ও অন্যান্য ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়লে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পণ্য পৌঁছানোর খরচও বাড়ে। ফলে উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কৃষিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের ঝুঁকি
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। জমি প্রস্তুত করা, সেচ দেওয়া, ফসল কাটা, মাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সেচনির্ভর বোরো ধানের উৎপাদনে জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে দুটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একদিকে কৃষক যদি বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনমূল্য না পান, তাহলে তার লাভ কমবে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তার খাদ্যব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
অর্থাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু পরিবহন খাতের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কৃষি, খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারব্যবস্থার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শিল্প খাতেও বাড়বে ব্যয়ের চাপ
দেশের শিল্প খাত এরই মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং দুর্বল চাহিদার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে।
গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে। কারখানার পণ্য পরিবহন, নিজস্ব যানবাহন, জেনারেটর এবং অন্যান্য কার্যক্রমে জ্বালানি খরচ হয়। ফলে বাড়তি ব্যয় উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমাতে পারে অথবা পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে।
পণ্যের দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আর বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ না থাকলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিমাণ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বিনিয়োগের সিদ্ধান্তেও পড়তে পারে।
প্রশ্ন উঠছে জ্বালানির কর কাঠামো নিয়ে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক কাঠামোও আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে ডিজেল আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ২০২৫ সালের জুন থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর কর-শুল্ক নির্ধারণে আগের নির্ধারিত ট্যারিফ ভ্যালুর পরিবর্তে ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক পদ্ধতি কার্যকর হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি মূল্য বাড়লে কর-শুল্কের অঙ্কও বাড়ে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বিপিসির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে প্রতি লিটারে সংস্থাটির করভার আগের ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগস্টে ডিজেলের ওপর শুল্ক ও করের মোট পরিমাণ ছিল ৩২ টাকা ৪৪ পয়সা বলে বিপিসির তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ সাময়িকভাবে কর-শুল্ক কমানো বা কাঠামো পুনর্বিবেচনার কথা বলছেন। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক চাপের সময়ে করভার কিছুটা কমানো গেলে ভোক্তার ওপর সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে। এটি অবশ্য নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় এবং এতে সরকারের রাজস্ব আয় কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিপিসির আর্থিক চাপও আলোচনায়
জ্বালানির দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকারের অন্যতম যুক্তি হলো বিপিসির আর্থিক চাপ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ দাম এবং দেশে দীর্ঘ সময় পর পর মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় বিপিসি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। সংস্থাটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জমে থাকা লোকসান মেটাতে সহায়তাও চেয়েছে।
অন্যদিকে বিপিসির অতীতের আর্থিক অবস্থাও আলোচনায় এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ১১ বছরে বিপিসি প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তবে এই হিসাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের বড় লোকসান এবং আমদানি ব্যয়ের চাপও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ফলে প্রশ্নটি কেবল ‘দাম বাড়ানো হবে কি না’—এখানে আটকে নেই। জ্বালানি খাতে লোকসান, কর-শুল্ক, সরকারি সহায়তা, বিপিসির অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কেন বেশি
জ্বালানির দাম বাড়লে উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে। কারণ তাদের মাসিক আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়।
একজন শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীর আয় একই থাকলেও যদি বাসভাড়া, বাজার খরচ এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে তাকে অন্য কোনো খাতে ব্যয় কমাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয় কমে যায়। কেউ কেউ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত পরিবারের বাজেটের বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়লে মানুষের ভোগক্ষমতা কমতে পারে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদাতেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
জ্বালানি তেলের দাম এখন অক্টোবরের জন্য অপরিবর্তিত থাকলেও সেপ্টেম্বরের বড় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতিতে আরও কিছুদিন থাকতে পারে। পরিবহন ব্যয় ইতোমধ্যে সমন্বয় হয়েছে। এরপর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে সরকারের সামনে একাধিক নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে কত দ্রুত সমন্বয় করা হবে, বিপিসির লোকসান কীভাবে সামলানো হবে, কর-শুল্ক কাঠামো কী হবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত। তাই বাইরের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর চাপ আসবেই। কিন্তু সেই চাপ কীভাবে ভাগ করে নেওয়া হবে, সেটিই নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। শুধু ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানো, নাকি করব্যবস্থা, সরকারি ব্যয়, বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি ব্যবস্থার দক্ষতার দিকগুলোও একই সঙ্গে পর্যালোচনা করা—এই বিতর্কই এখন সামনে।
কারণ জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব একটি পেট্রোল পাম্পে শেষ হয় না। সেটি বাসের ভাড়া হয়ে ফিরে আসে, ট্রাকের ভাড়া হয়ে পণ্যের দামে যুক্ত হয়, কৃষকের সেচ খরচ বাড়ায়, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় পরিবারের মাসিক বাজেটে। তাই জ্বালানি নীতির প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির সবচেয়ে সাধারণ জায়গাটিতে—মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।








