কারখানাটির উৎপাদনক্ষমতা অনুযায়ী, গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাটি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন অন্তত এক হাজার ১০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সুযোগ হারানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা।
কারখানাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এএফসিসিএল ১৯৮৩ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। শুরুতে কারখানাটির দৈনিক সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা ছিল এক হাজার ৬০০ টন। পরবর্তী সময়ে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উৎপাদনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে কারখানাটি বছরে ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত বন্ধ থাকছে। কোনো কোনো বছর প্রায় পুরো সময়ই উৎপাদন বন্ধ ছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের মার্চ থেকে কারখানাটিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
Table of Contents
উৎপাদন ব্যাহত, ক্ষতির অঙ্ক বাড়ছে
কারখানার উৎপাদনক্ষমতার ভিত্তিতে হিসাব করে দেখা গেছে, ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৯ মাসে ছয় লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। প্রতি টন ইউরিয়ার বিক্রয়মূল্য ৪৮ হাজার টাকা ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। তবে এই অঙ্কটি সম্ভাব্য উৎপাদিত সারের বিক্রয়মূল্যের হিসাব; একে সরাসরি হিসাবভুক্ত নিট লোকসানের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও এর পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক দায়ের চাপ কমছে না। উৎপাদন না হওয়ায় কারখানার নিজস্ব মজুতও শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে কারখানাটির আওতাভুক্ত ডিলারদের চাহিদা আমদানি করা সার দিয়ে পূরণ করতে হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদনের একটি বড় সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে, অথচ বাজারের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
ইউরিয়া বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে এ সারের প্রয়োজন হয়। তাই স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। তবে আমদানি করা সারের পরিমাণ, মূল্য এবং কারখানাটি চালু থাকলে মোট কতটা আমদানি কমানো সম্ভব হতো—তা নির্ধারণে বিস্তারিত তুলনামূলক হিসাব প্রয়োজন।
বন্ধের সময় বাড়ার সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে
গত কয়েক অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে কারখানাটির উৎপাদন ব্যয়ের উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। উৎপাদন বন্ধ থাকার সময় বাড়ার পাশাপাশি টনপ্রতি ইউরিয়া উৎপাদনের হিসাবি ব্যয়ও বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কারখানাটি ২০০ দিন বন্ধ ছিল এবং টনপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ১২ হাজার টাকার বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বন্ধের সময় বেড়ে ২৯৬ দিনে দাঁড়ায়; তখন টনপ্রতি উৎপাদন খরচ হয় ২৬ হাজার টাকার বেশি।
পরবর্তী বছরগুলোতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৩৫ দিন বন্ধ থাকার সময় টনপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ১৭ হাজার টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১২ দিন বন্ধ থাকায় খরচ দাঁড়ায় ২০ হাজার টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪৩ দিন বন্ধ থাকার বিপরীতে টনপ্রতি ব্যয় ছিল ২৪ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে কারখানাটি ২৮৪ দিন বন্ধ ছিল এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার টাকা।
ব্যয় বৃদ্ধির ধারা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৩১ দিন বন্ধ থাকার পর টনপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ৪১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কারখানাটি ৩২৩ দিন বন্ধ ছিল; তখন টনপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে ৭১ হাজার টাকা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। ওই বছর কারখানাটি ৩৫৬ দিন বন্ধ থাকায় টনপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কারখানাটি চালু না থাকায় ওই বছরের উৎপাদন ব্যয়ের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
এক দশকে লোকসান ১১০০ কোটি টাকার বেশি
একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত আশুগঞ্জ সার কারখানাটি ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত লাভে ছিল। এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লোকসান ছিল ৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসান ছিল ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়। এসব অর্থবছরের হিসাব মিলিয়ে গত এক দশকে মোট লোকসানের পরিমাণ এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্বেগ, শ্রমিকদের ক্ষোভ
দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘ বিরতির পর গ্যাস সরবরাহ চালু হলেও কারখানাটি দ্রুত উৎপাদনে ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতেও গ্যাস পাওয়ার পর যান্ত্রিক সমস্যার কারণে উৎপাদন শুরু করতে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকার পর যন্ত্রপাতি চালুর উপযোগী করতে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে আরও সময় লাগতে পারে।
কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যেও এ পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় তাঁদের কাজের পরিবেশ ও বিভিন্ন সুবিধা প্রভাবিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
কারখানার সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মো. আবু কাউছার বলেন, গ্যাস রেশনিংয়ের নামে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ রাখার ফলে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। তাঁর মতে, দেশীয় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে আমদানি করা সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
কারখানাটির সিনিয়র সহসভাপতি মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার ১৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উৎপাদন না হওয়ায় শ্রমিকেরাও বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী শেখ মো. আলী আশরাফ জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আশুগঞ্জ সার কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কৃষি খাতে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তার পাশাপাশি কারখানার যন্ত্রপাতির অবস্থা মূল্যায়ন, সম্ভাব্য মেরামত ব্যয় নিরূপণ এবং উৎপাদন পুনরায় চালুর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। তবে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং কারখানাটি উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।








