খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই মার্চ ২০২৬, ৫:৩৭ পিএম

রুশ সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ম্যাক্সিম গোর্কি এক অনন্য নাম, যিনি কেবল একজন লেখক নন বরং সমাজের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনসংগ্রামের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রকৃত নাম আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ হলেও সাহিত্যজগতে তিনি “গোর্কি” নামেই সমধিক পরিচিত, যার অর্থ “তেতো”—একটি নাম, যা তাঁর জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
Table of Contents
১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিজনি নভগোরোদ শহরে তাঁর জন্ম। শৈশবেই তিনি পিতামাতাকে হারান এবং দারিদ্র্য, অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ না পেলেও বাস্তব জীবনই তাঁর সবচেয়ে বড় পাঠশালা হয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠোরতা তাঁকে পরিণত করে এক সংবেদনশীল ও পর্যবেক্ষণশীল মানুষে।
কৈশোরে জীবিকার তাগিদে তিনি নানা পেশায় কাজ করেন—রান্নাঘরের সহকারী, জাহাজের কর্মচারী, শ্রমিক এবং ভ্রমণকারী হিসেবে বহু স্থান ঘুরে দেখেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং সাহিত্যচর্চায় বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
গোর্কির সাহিত্যকর্ম মূলত শ্রমজীবী, দরিদ্র ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনকেন্দ্রিক। তিনি সাহিত্যকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম না ভেবে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর রচনায় উঠে এসেছে শোষণ, দারিদ্র্য এবং মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির গল্প।
| রচনার নাম | ধরন | বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| মা | উপন্যাস | শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজ পরিবর্তনের চেতনা |
| ফোমা গোর্দেয়েভ | উপন্যাস | ধনসম্পদের মোহ ও নৈতিক অবক্ষয় |
| বিভিন্ন গল্পসংকলন | গল্প | দরিদ্র ও ভবঘুরে মানুষের জীবনচিত্র |
| নিচু শ্রেণির গল্পসমূহ | প্রবন্ধ ও রচনা | সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন |
তিনি সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন, যা পরবর্তী সময়ে রুশ সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
গোর্কি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার একজন সমর্থক। রুশ বিপ্লবের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যদিও বিভিন্ন সময় তাঁর মতপার্থক্যের কারণে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ফলে জীবনের একটি বড় সময় তাঁকে দেশের বাইরে নির্বাসনে কাটাতে হয়।
১৯২১ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে রাশিয়ার লাখো মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন গোর্কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানান। তাঁর এই উদ্যোগ বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সহায়ক হয় এবং বিশ্বজুড়ে মানবিক সহানুভূতি সৃষ্টি করে।
১৯৩৪ সালে তাঁর একমাত্র পুত্রের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। পরে ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন নিউমোনিয়ায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন মত ও বিতর্ক আজও ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয়।
গোর্কি পাঁচবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তিনি পুরস্কারটি পাননি। তবুও তাঁর সাহিত্য ও চিন্তা বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং মানবিক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ম্যাক্সিম গোর্কি আমাদের শেখান—সাহিত্য কেবল কল্পনার জগৎ নয়, এটি বাস্তবতার প্রতিবাদ, সংগ্রামের ভাষা এবং মানবমুক্তির এক শক্তিশালী মাধ্যম।
মন্তব্য