ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম ও প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে এখানকার প্রতিটি বিপণিবিতান। এই হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারীর জীবিকা সরাসরি এসব বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন অজুহাতে জোরপূর্বক অতিরিক্ত অর্থ বা চাঁদা আদায়ের ক্রমবর্ধমান চাপে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এখানকার অসংখ্য ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের তীর এমন একটি প্রভাবশালী চক্রের দিকে, যারা অতীতেও বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই চক্রের নেপথ্যে রয়েছে কথিত ‘দরবেশ চক্র’। বিশেষ করে, এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। এমনকি তাদের মধ্যে বিএনপির নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী আলম গুম হওয়ার মামলার আসামিও রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের জোরালো দাবি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও এই প্রভাবশালী মহলের প্রভাব একটুও কমেনি; বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে তারা নতুন কৌশলে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তবে হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্য মুখ খুলতে সাহস পান না অধিকাংশ ব্যবসায়ী।
নানা অজুহাতে অর্থ আদায়ের এই দৌরাত্ম্যে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দোকান পরিচালনার নির্ধারিত খরচের বাইরে বিভিন্ন অছিলায় তাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়। কখনো দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গা ব্যবহারের নামে, কখনো প্রহরী বা নিরাপত্তার কথা বলে, আবার কখনো মার্কেট ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য সুবিধার নামে এই চাঁদাবাজি চলে। নির্দিষ্ট সময় পরপর চাঁদার অঙ্ক পরিশোধ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সরাসরি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়, যার ফলে প্রতিবাদ করার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলিস্তানের এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে জানান, ব্যবসা করতে গেলে এমনিতেই বিভিন্ন বৈধ খরচ বহন করতে হয়। এর ওপর আবার নানা নামে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। সময়মতো টাকা না দিলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে—এই আশঙ্কায় সবাই নিরবে মুখ বুজে সহ্য করে নেন। আরেক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা জোর করে নেওয়া হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব কোথায়? যদি এটি কোনো বৈধ ফি হতো, তবে অবশ্যই যথাযথ রসিদ ও নির্দিষ্ট খাত থাকত। কিন্তু বাস্তবে কোনো স্বচ্ছতা ছাড়াই এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিদিন গুলিস্তানের শত শত দোকান থেকে বিভিন্ন খাতের নামে তোলা অর্থের মোট পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। কে বা কারা এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করছে, কোন খাতে তা ব্যয় করা হচ্ছে, ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে কি না কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এই চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনর কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রধান দাবি হলো, গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে গোপনে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা হোক। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রকাশ্য পরিচয় দিয়ে মুখ খুলতে না পারলেও এই অভিযোগ বাক্সের মাধ্যমে চাঁদাবাজদের নাম, আদায়ের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং অর্থ সংগ্রহের গোপন কৌশলগুলো প্রশাসনের নজরে আনা সম্ভব হবে। প্রশাসন সেই তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
কোনো ধরনের সংঘাত বা বিশৃঙ্খলায় জড়াতে চান না গুলিস্তানের ব্যবসায়ীরা। তাদের একমাত্র মৌলিক চাওয়া হলো, সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করা। তাদের মতে, এই অর্থ আদায়ের বিষয়টি কেবল সাধারণ চাঁদাবাজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারে জীবিকা এবং মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। তাই কালক্ষেপণ না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং আর্থিক প্রবাহের এই অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করে, তবেই গুলিস্তান বাজারের দীর্ঘদিনের জিম্মি দশা কাটানো সম্ভব হবে।









