খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই মে ২০২৬, ১২:৫১ এএম

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় একটি বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত কক্ষ থেকে মাদক সেবনরত অবস্থায় ছয় যুবককে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গত রবিবার (৩ মে) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামস্থ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, কালাই উপজেলার চেচুরিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে নিয়মিত মাদকের আসর বসছে—এমন একটি সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সংস্থাটির একটি চৌকস দল সেখানে ঝটিকা অভিযান চালায়। অভিযান পরিচালনাকালে কর্মকর্তারা প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ওই ভবনের একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে মাদক সেবনরত অবস্থায় ছয়জনকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং উৎসুক জনতা বিদ্যালয়ের চারপাশে ভিড় জমান।
অভিযানে আটককৃত যুবকরা সবাই স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। তাদের পরিচয় নিচে উল্লেখ করা হলো:
লাল্টু মিয়া (২৬), পিতা: খলিল মিয়া, গ্রাম: পুরগ্রাম।
তৌহিদ হোসেন (২৮), পিতা: মৃত মিনা হোসেন, গ্রাম: পুরগ্রাম।
আব্দুল আজিজ (২২), পিতা: মিলন হোসেন, গ্রাম: জমিনপুর।
হাসান মিয়া (২২), পিতা: সামছুল মিয়া, গ্রাম: লওনা।
শফিকুল ইসলাম (২৫), পিতা: মনতাজ আলী, গ্রাম: গঙ্গা দাসপুর।
জিয়াউর রহমান (৪০), পিতা: শামসুদ্দিন, গ্রাম: ঝামুটপুর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চেচুরিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রায় ১৫ বছর আগে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা কাঠামোগত ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থীর অভাব এবং সরকারি এমপিওভুক্তি (Monthly Pay Order) লাভে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রায় দেড় দশক ধরে বিদ্যালয়ের ভবনগুলো সংস্কারহীন ও অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় এগুলো জরাজীর্ণ রূপ ধারণ করে। মূল জনবসতি থেকে কিছুটা নির্জন স্থানে অবস্থিত হওয়ায় পরিত্যক্ত এই কক্ষগুলো সহজেই মাদকসেবী ও বখাটেদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলাতেও সেখানে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যার পর তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করত।
দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চললেও স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। মাদকসেবীদের উগ্র আচরণ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার শঙ্কায় বিষয়টি অনেকটা চাপা পড়ে ছিল। ঘটনার বিষয়ে উদয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বেলাল হোসেন জানান, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর পদচারণা নেই। এর ফলে এটি জনমানবহীন ভূতুড়ে এক স্থানে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পরেই সেখানে মাদকসেবীদের বিচরণ শুরু হতো, যা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর শান্তিশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধমূলক কাজ বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, আটকদের কাছে মাদক সেবনের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা সরাসরি অপরাধের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় আটক হয়েছেন। আটককৃত ছয়জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে জয়পুরহাট আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জেলায় মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিত্যক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জরাজীর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্য হতে না পারে, সেজন্য আগামীতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং আকস্মিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে। সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, পরিত্যক্ত ভবনটি সংস্কার করে অন্য কোনো জনহিতকর কাজে ব্যবহার করা গেলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। বর্তমানে আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মন্তব্য