কল্যাণী ঘোষ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি

কল্যাণী ঘোষ—বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক অনন্য নাম, যিনি সংগীত, সংগ্রাম এবং দেশপ্রেমকে নিজের জীবন ও কণ্ঠে একসূত্রে গেঁথেছেন। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে শুধু একজন শিল্পীর কথা নয়, বরং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাসের কথাও স্মরণ করতে হয়। তিনি সেই বিরল কণ্ঠযোদ্ধাদের একজন, যাঁদের গান অস্ত্রের মতোই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে।

১৯৪৬ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে তাঁর জন্ম। পারিবারিক আবহ ছিল সাংস্কৃতিক চর্চায় সমৃদ্ধ। পৈতৃক নিবাস রাউজানের বীনাজুরী গ্রাম। মা লীলাবতী চৌধুরীর স্নেহ ও পিতা মনোমোহন চৌধুরীর সংস্কৃতিমনা মনোভাব তাঁর শিল্পীসত্তা গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। চট্টগ্রামের খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম বেতারে প্রথম গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে প্রচারিত গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। শরণার্থী শিবির, সীমান্ত অঞ্চল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পেছনের জনপদে তাঁর গান হয়ে ওঠে সাহস ও আশার প্রতীক। তিনি ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে যুক্ত থেকে সনজীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক এবং জহির রায়হানের মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাজ করেন।

ভারতের কলকাতায় রুমা গুহ ঠাকুরতার নেতৃত্বাধীন ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ারের সদস্য হিসেবে তিনি বিভিন্ন স্থানে সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর সহযাত্রী ছিলেন সহশিল্পী উমা খান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাই প্রবাল চৌধুরী। তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পরও কল্যাণী ঘোষের সৃজনশীল পথচলা থেমে থাকেনি। তিনি বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং মঞ্চে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে আসছেন ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে। পাশাপাশি তিনি বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘ ৩২ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে উপপরিচালক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অভিধান প্রণয়নসহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গবেষণায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক সংগীত, গণসংগীত, লেখক পরিচিতি, শিশু অভিধান এবং চরিতাভিধানসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ২০২৪ সালে তিনি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।

নিচে তাঁর জীবনের প্রধান দিকগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্ম৫ মে ১৯৪৬, রহমতগঞ্জ, চট্টগ্রাম
শিক্ষাজীবনখাস্তগীর স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কর্মজীবন শুরু১৯৬২, চট্টগ্রাম বেতার
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকাস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, শিল্পী সংস্থা
প্রধান প্রতিষ্ঠানবাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলা একাডেমি
স্বীকৃতিএকুশে পদক (২০২৪)

আজ তাঁর জন্মদিনে সমগ্র জাতি তাঁকে স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার গান আজও নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি হতে পারে মুক্তির শক্তিশালী