,

এলপিজি ধর্মঘট প্রত্যাহারে সরকারের কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

এলপিজি ব্যবসায়ীদের ঘোষিত দুই দিনের ধর্মঘট প্রত্যাহার না করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। রান্নার গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের দুই মন্ত্রী। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ে কারসাজি কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।

বুধবার সকালে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ অবস্থানের কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্মঘটের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ে কেউ কারসাজি করলে কিংবা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, তবে কোনো পক্ষের দেশকে জিম্মি করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।

জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, সরকার এলপিজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে চায়। ধর্মঘটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা বরদাশত করা হবে না। তিনি ব্যবসায়ীদের আগামী দুই দিনের ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

এলপিজি খাতে সরকার ভর্তুকি দেয় না উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী ভারতে এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এলপিজির দাম সহনীয় রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশজুড়ে দোকান বন্ধের ঘোষণা

গত ১২ অক্টোবর এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি সেলিম খান এ কর্মসূচির কথা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে দুই দিনের কর্মসূচির পর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকা হতে পারে।

ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে পরিবেশকদের কমিশন বৃদ্ধি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জরিমানা এবং হয়রানি বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান ব্যবসায়িক কাঠামো এবং প্রশাসনিক অভিযানের কারণে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যার মুখে পড়ছেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে আলোচনা হলেও সরবরাহ বন্ধ করে কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনা ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবার ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মিত সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দোকান বন্ধ থাকলে বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ কিংবা অতিরিক্ত দামে গ্যাস কেনার চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকারের অবস্থান, ব্যবসায়ীদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সরবরাহ বন্ধ রেখে জনসাধারণকে ভোগান্তিতে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং দাবি নিষ্পত্তিতে দুই পক্ষের আলোচনাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা

এলপিজির দাম নিয়ে অসন্তোষের পেছনে রয়েছে নির্ধারিত মূল্য ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান। গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও বিক্রেতারা সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ পরিবারের রান্নার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ছোট খাবারের দোকান ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরদের দাবি, তাঁরা সরকার নির্ধারিত দামেই পরিবেশকদের কাছে গ্যাস বিক্রি করছেন। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তাঁরা অস্বীকার করেছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, অপারেটর পর্যায়ে নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ কেন উঠছে। সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন, মজুত এবং বিক্রয়মূল্য যাচাই করলে এ ব্যবধানের কারণ স্পষ্ট হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে পৃথক তদন্তের ফলাফল সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি।

কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম নিয়ে সরকারের তৎপরতা

এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে সরকার আগেও একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা মন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, দেশে গ্যাসের সংকট নেই।

এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। ৩ অক্টোবর আমদানিকারকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বাজারে সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা এবং ভোক্তাদের কাছে নির্ধারিত দামে গ্যাস পৌঁছানো নিশ্চিত করা। কিন্তু অপারেটরদের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার দাবি এবং খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তার ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।

বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার দাবি করা হলেও ক্রেতারা যদি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পান, তাহলে তাঁদের দুর্ভোগ কমবে না। এ কারণে শুধু সরবরাহের পরিমাণ নয়, গ্যাসের বণ্টন, মজুত এবং খুচরা বিক্রির মূল্যও নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন।

আগেও ধর্মঘটে বন্ধ হয়েছিল সরবরাহ

এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা দেশজুড়ে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাসের পর সেদিন বিকেলেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবারও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে ব্যবসায়ীরা তাঁদের দাবি থেকে সরে আসবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশের বহু পরিবার রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানে সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। সরকার ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থার সতর্কবার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা তাঁদের দাবি পূরণের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। তবে ধর্মঘট হোক বা না হোক, বাজারে এলপিজির নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা এবং নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করাই এখন ভোক্তাদের প্রধান প্রত্যাশা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।