ঢাকার ধামরাই উপজেলার বাইসাকান্দা ইউনিয়ন সদরের বাসিন্দা সুমন রাজবংশী ওরফে অপু রাজবংশীর আত্মহননের ঘটনায় এলাকাজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুদখোর মহাজনদের লাগাতার মানসিক চাপ, হুমকি ও আর্থিক নিঃস্বতার মুখে পড়ে তিনি চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ঘটনাটি শনিবার সংঘটিত হয়। আত্মহননের আগে স্ত্রী ফুলমালা রাজবংশীর উদ্দেশে তিন পাতার একটি শেষ চিঠিতে তিনি নিজের দুর্দশার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং দায়ীদের নাম উল্লেখ করেন।
চিঠিতে অপু রাজবংশী লেখেন যে, মহাজন শাহিন আলম ও জাহাঙ্গীর আলমের অব্যাহত চাপ তাঁকে বাঁচতে দেয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, ঋণের টাকা শোধ করতে না পারায় তাঁর বসতভিটা ও জমিজমা লিখে নেওয়া হয় এবং জীবিকার শেষ সম্বল ভ্যানগাড়িটিও বিক্রি করে নেওয়া হয়। এসবের পরও তাঁর ওপর বড় অঙ্কের টাকা দাবি অব্যাহত ছিল। প্রতিদিনের এই মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন। স্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি অনুরোধ জানান, যেন দায়ীদের ক্ষমা না করা হয় এবং ন্যায়বিচারের জন্য আইনি পথে এগোনো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অপু রাজবংশী পেশায় দিনমজুর ও ভ্যানচালক ছিলেন। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি কুশুরা ইউনিয়নের কান্টাহাটি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম এবং আমছিমুর গ্রামের শাহিন আলমের কাছ থেকে ঋণ নেন। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার টাকা ধার নেওয়ার বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে ১,০০০ টাকা করে সুদ দিতে হতো। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুদ চক্রবৃদ্ধি আকারে বাড়তে থাকে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বহুগুণে পরিণত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই ধরনের উচ্চসুদের ঋণব্যবস্থা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য মারাত্মক ফাঁদে পরিণত হয়—এমন মন্তব্য করেন সচেতন মহল।
ঋণের শর্ত ও প্রভাব (সংক্ষেপে):
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ধার নেওয়া অর্থ | ১০,০০০ টাকা |
| সাপ্তাহিক সুদ | ১,০০০ টাকা |
| সুদের ধরন | উচ্চ সুদ/চক্রবৃদ্ধিমুখী |
| ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ | বসতভিটা, জমি, ভ্যানগাড়ি |
| ফলাফল | ঋণভার বহুগুণ বৃদ্ধি, মানসিক চাপ |
ধামরাই থানার এসআই লিজা আক্তার জানান, অপু রাজবংশীর মরদেহ উদ্ধার করে প্রাথমিকভাবে একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, চিঠির বিষয়বস্তু ও পারিবারিক অভিযোগ তদন্তের আওতায় নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মীরা উচ্চসুদের ঋণচক্র দমনে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে নজরদারি বাড়ানো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়া এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহজশর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক চাপের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
