ইসলামি বিপ্লবের অগ্নিপরীক্ষা: ট্রাম্পের পতন নিশ্চিত বললেন খামেনি

ইরানের চার দশকের ইসলামি শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনের মুখে শুক্রবার প্রথমবার জনসমক্ষে মুখ খুলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি অত্যন্ত কঠোর সুরে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো চাপ বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একচুলও পিছু হটবে না। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম দম্ভের অবসান ও শোচনীয় পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

আন্দোলনের তীব্রতা ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করার পাশাপাশি বেশ কিছু সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে। এই গণবিস্ফোরণ রুখতে ইরান সরকার ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের পথ বেছে নিয়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ইরান টানা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বর্তমান এই আন্দোলন ধর্মতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

ইরান সংকট ২০২৬: খামেনি বনাম ট্রাম্পের পাল্টাপাল্টি অবস্থান

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও মূল তথ্য
বিক্ষোভের বর্তমান গতি৩ জানুয়ারি থেকে তীব্রতর হয়ে টানা দুই সপ্তাহে পদার্পণ।
খামেনির প্রধান ভাষ্যবিক্ষোভকারীরা মূলত মার্কিন উসকানিতে পুষ্ট ‘নাশকতাকারী’।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিআন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালালে কঠোর সামরিক আঘাত।
ঐতিহাসিক তুলনাট্রাম্পের পরিণতি হবে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির মতো।
ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণদেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও সেন্সরশিপ।
ট্রাম্পের দাবিখামেনি ক্ষমতা ছেড়ে দেশান্তরী হওয়ার পথ খুঁজছেন।

ট্রাম্পের পতন ও শাহের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

বিক্ষোভের পর প্রথম ভাষণে খামেনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক মেজাজে কথা বলেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাত এক হাজারেরও বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত। তিনি গত বছরের জুনে সংঘটিত যুদ্ধে মার্কিন সমর্থনের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পকে ‘অহংকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন। খামেনির মতে, ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যই তাঁর পতন ডেকে আনবে। তিনি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির উদাহরণ টেনে বলেন, “বিশ্বের বড় বড় স্বৈরশাসকরা যখনই তাদের অহংকারের চূড়ায় পৌঁছেছে, তখনই তাদের পতন হয়েছে। ট্রাম্পকেও একদিন একই পরিণতির মুখে পড়তে হবে।”

আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি আলটিমেটাম

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি রক্তপাত ঘটায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইরান ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে খামেনি এই বক্তব্যকে উপেক্ষা করে তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, লাখো শহীদের রক্তে গড়া এই শাসনব্যবস্থা কতিপয় ‘ভাড়াটে নাশকতাবাজদের’ ভয়ে আত্মসমর্পণ করবে না।

ইরানের রাজপথে যখন বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই সরাসরি বাদানুবাদ বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে। একপক্ষ যেখানে ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার দাবিতে অনড়, অন্যপক্ষ সেখানে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে মরিয়া। এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত ফলাফল কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন গভীর পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।