ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দেশটির বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরানকে ঘিরে নতুন উদ্যোগের বিষয়েও কথা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হওয়ায় নতুন সামরিক অভিযানের আশঙ্কা সামনে এসেছে।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর আগেও একই ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যৌথ সামরিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পাল্টা জবাবে ইসরায়েলে হামলা চালায় তেহরান। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
সংঘাতের প্রভাব দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। জ্বালানির দামে দেখা দেয় অস্থিরতা।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটিতে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা কিংবা নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হওয়ায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এর মধ্যেই নেতানিয়াহুর নতুন বক্তব্য সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে এ লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কথাও জানান তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা ইরানের সরকারের পতন ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গতকালসহ বহুবার আমি এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছি।’
তবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। সম্ভাব্য হামলার সময়, লক্ষ্যবস্তু কিংবা সামরিক কৌশল সম্পর্কেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার অঘোষিত সফরে ইসরায়েলে যান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় ইরান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত উভদা বিমানঘাঁটিতে নেতানিয়াহু ও হেগসেথের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে স্পিলম্যান বলেন, আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অংশীদারত্ব নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় ধরনের সামরিক কৌশলে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ নিয়মিতভাবে নিজেদের অবস্থান সমন্বয় করে থাকে। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে নেতানিয়াহু ও হেগসেথের বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বৈঠকের বিস্তারিত আলোচ্যসূচি কিংবা সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কেও প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অঘোষিত ইসরায়েল সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে বৈঠকের বিষয়ে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও।
নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ইসরায়েল সফর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক ও সামরিক সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।









