ইরানের খেজুর রপ্তানি আয় বেড়ে ২১৩ মিলিয়ন ডলার

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান ২০২৪ সালে তাদের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য খেজুর রপ্তানিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরে দেশটির তাজা ও শুকনা খেজুর রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অ-তেলজাত পণ্য রপ্তানি বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য ইরান নির্ধারণ করেছে, তাতে খেজুর একটি কৌশলগত পণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।


রপ্তানি পরিসংখ্যান ও বাজার বিশ্লেষণ

২০২৪ সালে ইরান বিশ্ববাজারে মোট ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৪৬ টন খেজুর রপ্তানি করেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২১৩.০৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ববাজারে ইরানি খেজুরের জনপ্রিয়তা এবং গুণগত মান বৃদ্ধির ফলে গত পাঁচ বছরে (২০২০-২০২৪) রপ্তানি মূল্য গড়ে ৯ শতাংশ এবং রপ্তানির পরিমাণ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি টন ইরানি খেজুরের গড় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬৪১ ডলারে।

ইরানি খেজুরের প্রধান আন্তর্জাতিক গন্তব্যসমূহ:

দেশের নামরপ্তানির হার (শতাংশ)অবস্থানের ক্রম
ভারত১৯.৫%প্রথম
সংযুক্ত আরব আমিরাত১১.০%দ্বিতীয়
পাকিস্তান৭.৩%তৃতীয়
তুরস্ক৬.৮%চতুর্থ
কাজাখস্তান৪.৯%পঞ্চম

উৎপাদন অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা

ইরান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খেজুর উৎপাদকদের মধ্যে অন্যতম। দেশটির কেরমান, সিস্তান-বালুচিস্তান, হরমোজগান, খুজেস্তান, বুশেহর ও ফারস প্রদেশে বাণিজ্যিকভাবে উন্নতমানের খেজুর চাষ হয়। দেশটিতে উৎপাদিত মোট খেজুরের প্রায় ৭০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়, যার চাহিদা পবিত্র রমজান মাসে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাকি ৩০ শতাংশ বা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন খেজুর আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়।

মূল্য সংযোজন ও আধুনিকায়ন

ঐতিহাসিকভাবে ফসল তোলার পর সঠিক সংরক্ষণের অভাবে ইরানে প্রায় ৩০ শতাংশ খেজুর নষ্ট হয়ে যেত। এই ক্ষতি কমিয়ে আনতে এবং বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্য নিশ্চিত করতে ইরান সরকার এখন ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ বা মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। খেজুর থেকে সিরাপ, পেস্ট, পাউডার ও চকোলেটের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির মাধ্যমে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইরানের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব

ইরানের সামগ্রিক জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১১ থেকে ১৪ শতাংশ এবং এটি দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ কর্মসংস্থানের যোগান দেয়। বছরে ১২৫ থেকে ১৩০ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশটি তার অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।

ইরানি কৃষির বৈশ্বিক অবস্থান:

  • পেস্তা ও জাফরান: ইরান বিশ্বের বৃহত্তম পেস্তা ও জাফরান উৎপাদনকারী দেশ। প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমি নিয়ে ইরানের পেস্তা বাগান বিশ্বখ্যাত।

  • খাদ্য নিরাপত্তা: গম, যব, ধান ও ভুট্টা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশটি তার কৌশলগত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

  • রপ্তানি বৈচিত্র্য: ইরানের মোট অ-তেল রপ্তানির প্রায় ১৭.৭ থেকে ৩০ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ইরানি কৃষিপণ্য নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদী খরার কারণে পানির তীব্র সংকট ইরানের কৃষি খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার ও আধুনিক কৃষি উপকরণের আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং জ্ঞানভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে ভর্তুকি ও করছাড় প্রদান করছে। খেজুরের এই ক্রমবর্ধমান রপ্তানি সাফল্য ইরানের কৃষি বিপ্লবকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।