ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক ভাস্কর্য প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে আট ফুট উচ্চতার সোনালি এই ভাস্কর্যে ট্রাম্পকে নগ্ন অবস্থায় দেখানো হয়েছে। ভাস্কর্যটির নাম ‘অরেঞ্জ প্লেগ’। প্রদর্শনী ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ডেনমার্কের শিল্পী জেনস গালচিওটের তৈরি ভাস্কর্যটিতে ট্রাম্পের এক হাতে রয়েছে গলফ ক্লাব। অন্য হাতে তিনি ধরে আছেন ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা। কাছেই রাখা হয়েছে এমন একটি গলফ বল, যার আকৃতি পৃথিবীর মতো। শিল্পকর্মটির এই উপস্থাপনায় গলফ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, ন্যায়বিচার ও বৈশ্বিক সংকটের বিষয়গুলোকে একই ফ্রেমে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভাস্কর্যটি ‘কিং অব ইনজাস্টিস’ বা ‘অবিচারের রাজা’ নামেও পরিচিত। এতে নগ্ন ট্রাম্পকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও আংশিক পোশাক পরা এক ব্যক্তির কাঁধে বসে থাকতে দেখা যায়। ওই ব্যক্তিকে দেখে মনে হয়, তিনি ট্রাম্পকে নিজের শরীরে বহন করে চলেছেন। এর মাধ্যমে ক্ষমতাবান একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের ভার সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ভাস্কর্যের বেদিতে থাকা লেখাতেও সেই ভাবনাই ফুটে উঠেছে। সেখানে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যিনি অন্যের ভারে ক্রমেই নুয়ে পড়ছেন। অথচ যিনি তাঁর ওপর বসে আছেন, তিনি সহায়তার কথা বললেও সেই বোঝা সরিয়ে নিচ্ছেন না। শিল্পীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রতীকী উপস্থাপনা ক্ষমতা ও তার পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি ভবনের সংযোগস্থলের ব্যস্ত একটি জায়গায় ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে এটি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন একটি সরাসরি রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করায় শিল্পকর্মটি বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
গালচিওট জানিয়েছেন, ভাস্কর্যটির মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে চান। তাঁর মতে, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
শিল্পীর বক্তব্যে জলবায়ু সংকটের প্রসঙ্গটিও বিশেষভাবে এসেছে। পৃথিবীর আদলে তৈরি গলফ বলটি সেই বার্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গলফ ক্লাবের সঙ্গে পৃথিবীর প্রতীক যুক্ত করে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পরিবেশগত সংকটের মধ্যে একটি প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
২৩ ক্যারেট সোনার পাতে মোড়ানো ভাস্কর্যটির ধারণার পেছনে রয়েছে ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত রূপকথা ‘দ্য এম্পেররস নিউ ক্লথস’। গল্পটিতে এক দাম্ভিক শাসক বিশ্বাস করেন, তিনি অত্যন্ত মূল্যবান পোশাক পরে আছেন। বাস্তবে তিনি নগ্ন। কিন্তু ভয় ও চাটুকারিতার কারণে আশপাশের কেউ সত্যটি প্রকাশ করার সাহস করে না। শেষ পর্যন্ত একটি শিশু শাসকের নগ্নতার বিষয়টি প্রকাশ্যে বলে দেয়।
গালচিওটের মতে, তাঁর ভাস্কর্যেও একই ধরনের প্রতীকী ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে ঘিরে থাকা চাটুকারিতা, ভয় এবং সত্য প্রকাশের অনীহাকে শিল্পের মাধ্যমে প্রশ্ন করা হয়েছে। নগ্নতার ব্যবহার তাই শুধু বিতর্ক তৈরির জন্য নয়; বরং ক্ষমতার আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে সামনে আনার একটি প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও ডেনমার্কের রাজনীতিক পার ক্লসেনও ভাস্কর্যটি নিয়ে ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এমন একটি ভাস্কর্য প্রদর্শন সহ্য করা গেলেও বিশ্বমঞ্চে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার মানুষের রয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনে ভাস্কর্যটির প্রদর্শনী নিয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
‘অরেঞ্জ প্লেগ’ অবশ্য স্ট্রাসবার্গে প্রথমবার প্রদর্শিত হচ্ছে না। গত বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ সোনালি ভাস্কর্যটি প্রথম প্রদর্শিত হয়। পরে এ বছর জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের সময়ও এটি প্রদর্শন করা হয়েছিল।
ভাস্কর্যটি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্পীর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সমালোচনার অধিকার। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্থাপনায় এমন একটি শিল্পকর্মের উপস্থিতি সেই বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করেছে। ট্রাম্পকে ঘিরে শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হলেও, ভাস্কর্যটির প্রতীকী ভাষা রাজনৈতিক ক্ষমতা, ন্যায়বিচার, জলবায়ু সংকট এবং জনজবাবদিহিতার মতো বৃহত্তর বিষয় নিয়েও দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করছে।









