বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছেন যারা মাঠের পারফরম্যান্সে অতুলনীয় হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসের পাতায় ব্রাত্য হয়ে রইলেন। আর্নেস্ট ভিলিমভস্কি তেমনই এক ফুটবলার, যাঁর পায়ের জাদু পোল্যান্ড ও জার্মানি—উভয় দেশের ফুটবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছিল। অথচ বিয়োগান্তক বাস্তবতার কারণে পোল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে তিনি আজ এক ‘অদৃশ্য’ মানুষ। পোলিশ জাতীয় স্টেডিয়াম কিংবা কোনো স্মারক স্তম্ভে তাঁর নাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যদিও ১৯৩৮ বিশ্বকাপে এক ম্যাচে চার গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ডটি তাঁরই দখলে ছিল।
Table of Contents
জন্ম ও শৈশব: অস্থির এক সময়ের সাক্ষী
আর্নেস্ট ভিলিমভস্কির জন্ম ১৯১৬ সালের ২৩ জুন তৎকালীন জার্মান সাম্রাজ্যের কাতোভিচে। জন্মসূত্রে তাঁর নাম ছিল আর্নেস্ট অটো প্রাডেলা। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন; তাঁর বাবা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারান। যুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির অধীনে কাতোভিচ শহরটি পোল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর মা পরবর্তীতে পোলিশ নাগরিক রোমান ভিলিমভস্কিকে বিয়ে করলে আর্নেস্ট তাঁর সৎবাবার পদবি গ্রহণ করেন এবং আর্নেস্ট ভিলিমভস্কি নামে পরিচিত হন।
শারীরিক গড়নে কিছুটা ভিন্নধর্মী আর্নেস্টের ডান পায়ে জন্মগতভাবে ছয়টি আঙুল ছিল। অদ্ভুত শোনালেও, ভিলিমভস্কি একে নিজের সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করতেন। মাঠের ক্ষিপ্রতা আর সৃজনশীলতা তাঁকে সমসাময়িক স্ট্রাইকারদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
ক্লাব ও জাতীয় দলে সাফল্যের পরিসংখ্যান
ভিলিমভস্কির পেশাদার ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ কাটে পোলিশ ক্লাব ‘রুখ চোরজো’-তে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে তিনি ক্লাবটির হয়ে পাঁচবার পোলিশ লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পান। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯৩৪ ও ১৯৩৬ সালে তিনি লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পোল্যান্ডের হয়ে তাঁর পরিসংখ্যান যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য ঈর্ষণীয়।
আর্নেস্ট ভিলিমভস্কির ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান (সংক্ষিপ্ত):
| বিষয় | তথ্য/পরিসংখ্যান |
| জন্ম | ২৩ জুন, ১৯১৬ (কাতোভিচ) |
| পোল্যান্ডের হয়ে ম্যাচ ও গোল | ২২ ম্যাচে ২১ গোল |
| জার্মানির হয়ে ম্যাচ ও গোল | ৮ ম্যাচে ১৩ গোল |
| বিশ্বকাপ রেকর্ড (১৯৩৮) | ব্রাজিলের বিপক্ষে ১ ম্যাচে ৪ গোল |
| প্রধান ক্লাব | রুখ চোরজো (Ruch Chorzów) |
| জাতীয়তা | পোলিশ (১৯৩৪–৩৯), জার্মান (১৯৪১–৪২) |
| মৃত্যু | ৩০ আগস্ট, ১৯৯৭ (জার্মানি) |
১৯৩৮ বিশ্বকাপ: সেই অবিস্মরণীয় চার গোল
ভিলিমভস্কির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। স্ট্রাসবুর্গে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল পোল্যান্ড। প্রথমার্ধে ৩-১ গোলে পিছিয়ে পড়ে পোল্যান্ড হারের শঙ্কায় থাকলেও একা লড়ে যান ভিলিমভস্কি। দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক করে তিনি স্কোর ৪-৪ সমতায় ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে তিনি ব্যক্তিগত চতুর্থ গোলটি করলেও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল ৬-৫ ব্যবধানে জয়লাভ করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই প্রথম খেলোয়াড় যিনি এক ম্যাচে ৪ গোল করার কীর্তি গড়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি
১৯৩৯ সালের ২৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ের ম্যাচেও হ্যাটট্রিক করেন তিনি। পোলিশরা একে ‘দ্য লাস্ট গেম’ বলে অভিহিত করে, কারণ এর চার দিন পরেই নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করে। যুদ্ধের ডামাডোলে ভিলিমভস্কি নিজেকে পোলিশ-জার্মান বা সাইলেসিয়ান হিসেবে পরিচয় দিতেন। পরিস্থিতির চাপে তিনি জার্মানির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং নাৎসিদের অধীনে ফুটবলে অংশ নেন।
অনেকে একে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করলেও এর পেছনে ছিল পারিবারিক এক আর্তনাদ। এক রুশ ইহুদির সঙ্গে প্রণয় থাকার অপরাধে তাঁর মা আউশভিৎজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। ধারণা করা হয়, জার্মানির হয়ে ফুটবল খেলার শর্তেই তিনি তাঁর মাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। জার্মানির হয়ে ৮ ম্যাচে ১৩ গোল করার পর ১৯৪২ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
নির্বাসন ও শেষ জীবন
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট সরকার ভিলিমভস্কিকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাঁর দেশে ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আর পোল্যান্ডে ফিরতে পারেননি। ১৯৭৪ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে পোলিশ দলের সাথে দেখা করতে চাইলে তৎকালীন পোলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে অনুমতি দেননি। ১৯৯৭ সালে জার্মানির কার্লসরুহেতে এই মহান ফুটবলার লোকচক্ষুর অন্তরালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পোল্যান্ডের ফুটবলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়েও তিনি আজও তাঁর নিজ দেশে এক ট্র্যাজিক ও ব্রাত্য চরিত্র হিসেবে রয়ে গেছেন।
