জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুলাই ২০২৬, ৯:৪১ পিএম

ফেসবুকের নিউজফিডে ইদানীং বারবার ভেসে উঠছে একটি গান—‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে, শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। কেউ নিজের ছবির সঙ্গে, কেউ ভিডিওতে, আবার কেউ নিছক কোনো আবেগঘন মুহূর্তকে ঘিরে গানটি ব্যবহার করছেন। সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কেন্দ্র করে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, শিল্পী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গানটির মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করছেন। সেই সূত্রেই নতুন প্রজন্মের কাছেও আবার আলোচনায় এসেছে ডিফ্রেন্ট টাচের জনপ্রিয় গানটির কণ্ঠশিল্পী মেসবা রহমান।
তবে গানটির নতুন করে আলোচনায় আসার ঘটনাটি মেসবার কাছে কেবল পুরোনো জনপ্রিয়তার পুনরাবৃত্তি নয়। বরং তাঁর চোখে এটি একটি গানের মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরও প্রমাণ। মানুষের প্রতিবাদ, সংহতি কিংবা অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হিসেবে কয়েক দশক পরও কোনো গান ফিরে আসতে পারে—এটিকে নিজের এবং ডিফ্রেন্ট টাচের জন্য বড় প্রাপ্তি বলেই মনে করেন তিনি।
গানটির জন্মের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। ১৯৮৭ সালে ডিফ্রেন্ট টাচের নতুন অ্যালবামের জন্য আরেকটি গান প্রয়োজন ছিল। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিভেজা এক শ্রাবণের রাতে গীতিকার আশরাফ বাবুর মনে আসে গানের প্রথম পঙ্ক্তি—‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। সেই রাতেই গানটির কথা লেখা হয়। পরে মেসবার কণ্ঠ ও ডিফ্রেন্ট টাচের সংগীতায়োজনে গানটি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে ব্যান্ডটির অন্যতম পরিচিত ও স্বাক্ষরধর্মী গান।
সাম্প্রতিক সময়ে গানটি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মেসবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ডিফ্রেন্ট টাচের গান নতুন করে ব্যবহৃত হওয়া তাঁদের জন্য আনন্দের বিষয়। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজের অনুভূতি নানা উপায়ে প্রকাশ করেন। কখনো তা বিতর্কের জন্ম দেয়, আবার কখনো কোনো গান বা শিল্পকর্ম মানুষের একাত্মতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ব্যবহৃত ভিডিওতে তিনি আপত্তিকর কিছু দেখেননি বলেও জানান। মানুষের সংহতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গানটির এই নতুন যাত্রাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তিনি।
কথা বলতে গিয়ে মেসবা ফিরে যান ডিফ্রেন্ট টাচের শুরুর সময়ের স্মৃতিতে। তাঁর মনে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি ঈদের অনুষ্ঠান, যেখানে প্রথমবারের মতো ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ পরিবেশন করা হয়েছিল। তখন সংগীতের প্রধান মাধ্যম ছিল অডিও ক্যাসেট ও অ্যালবাম। টেলিভিশনে গানটি প্রচারের পর ডিফ্রেন্ট টাচকে আরও বেশি মানুষ চিনতে শুরু করেন। পরে অ্যালবাম প্রকাশিত হলে গানটির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
গানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেসবার বেশ কিছু মজার স্মৃতিও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্টের ঘটনা এখনও তাঁর মনে দাগ কেটে আছে। প্রথম বছর মুক্তমঞ্চে গানটি শুরু করার পরপরই শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। বাদ্যযন্ত্রের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনুষ্ঠান থামিয়ে দিতে হয়। পরের বছর আবারও তাঁকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সেবারও গান শুরু হতেই বৃষ্টি নামে। একই গান, একই ধরনের পরিস্থিতি—ঘটনাটি এখন মেসবার কাছে বেদনাদায়ক নয়, বরং মধুর এক স্মৃতি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশেও গানটি পরিবেশন করে একই ধরনের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন তিনি। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ শুরু হলেই অনেক জায়গায় দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কখনো মেসবা গানের কোনো লাইন ভুলে গেলে কিংবা মনে করতে একটু সময় নিলে দর্শকেরাই সেই অংশ গেয়ে ওঠেন। একজন শিল্পীর কাছে শ্রোতাদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে বিশেষ অনুভূতির। কারণ এতে বোঝা যায়, গানটি কেবল শোনা হয়নি; মানুষের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গেও মিশে গেছে।
মেসবার মতে, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে শুধু গানের কথা কিংবা সুরের অবদান নেই। এর সংগীতায়োজনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে গানের শুরুতে গিটারের যে পরিচিত সাউন্ড শোনা যায়, সেটিই অনেক শ্রোতার মধ্যে প্রথম আবেগের সংযোগ তৈরি করে। তাঁর মতে, একটি গান যতই ভালো লেখা বা সুর করা হোক, যথাযথ কম্পোজিশন ও সংগীতায়োজন ছাড়া সেটি শ্রোতার কাছে প্রত্যাশিতভাবে পৌঁছানো কঠিন।
পুরোনো এই গান নিয়ে নতুন করে আলোচনা হলেও মেসবা অবশ্য অতীতে আটকে থাকতে চান না। বর্তমানে নিয়মিত স্টেজ শো ও কনসার্ট নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি গাজীপুর, কুমিল্লা, খুলনা ও বগুড়ায় সংগীত পরিবেশন করেছেন। সংসদ ভবন এলাকায় আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টেও অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের একটি আয়োজনেও গান গেয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি নতুন গান প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে। মেসবা জানান, বেশ কয়েকটি নতুন গান ইতিমধ্যে বিভিন্ন মঞ্চে পরিবেশন করা হচ্ছে এবং সেগুলো নিয়ে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়াও আশাব্যঞ্জক। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’, ‘দৃষ্টি প্রদীপ’ কিংবা ‘মন কী যে চায়’-এর মতো নতুন গানও শ্রোতাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী জায়গা করে নেবে বলে আশাবাদী তিনি।
নতুন গানগুলোর স্টুডিও রেকর্ডিংয়ের কাজ চলছে। এবার শুধু অডিও নয়, ভিডিওসহ গান প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে গানগুলো শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে চান মেসবারা। শুরুতে এককভাবে গান প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও ভবিষ্যতে একসঙ্গে কয়েকটি গান নিয়ে বিশেষ আয়োজন করার কথাও ভাবছেন তাঁরা।
মেসবার কাছে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’র সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা তাই একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে নতুন দায়িত্বেরও। কয়েক দশক পর নতুন প্রজন্মের মানুষ যখন আবার ডিফ্রেন্ট টাচের গান খুঁজে নিচ্ছেন, তখন সেটিই তাঁকে নতুন করে সৃষ্টিশীল হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। পুরোনো গান মানুষের হৃদয়ে টিকে আছে—এটি যেমন তাঁর জন্য বড় স্বীকৃতি, তেমনি সেই ভালোবাসার জবাব দিতে নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে ফেরার তাগিদও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মেসবার প্রতিশ্রুতি, নতুন কাজের প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করে খুব শিগগিরই শ্রোতাদের সামনে হাজির হবেন তিনি। আর শ্রাবণের বৃষ্টির মতোই পুরোনো সেই গান যখন নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসছে, তখন মেসবা ও ডিফ্রেন্ট টাচের সংগীতযাত্রায় সেটি নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মন্তব্য