অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক আপাতত টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। বরং শরীর যতদিন অনুমতি দেবে, ততদিন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সাদা পোশাকে খেলে যেতে চান বলে জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অবস্থানই স্পষ্ট করেছেন ৩৬ বছর বয়সী এই পেসার।
ম্যাকেতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে স্টার্কের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। ম্যাচে তিনি মোট ১০ উইকেট নেন—প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৪টি। তার বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়। দ্বিতীয় ইনিংসেও ৯৫ রানের বেশি করতে পারেনি সফরকারীরা। ফলে মাত্র দুই দিনেই অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানের জয় তুলে নেয়।
স্টার্কের ম্যাচসেরা হওয়ার পাশাপাশি সিরিজসেরার পুরস্কারও পাওয়ার পেছনে এই পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে। দুই টেস্টের সিরিজে তিনি মোট ১২টি উইকেট নেন। দ্বিতীয় টেস্টে তার ১০ উইকেটের সংগ্রহ ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে চতুর্থবারের মতো এক ম্যাচে ১০ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি।
নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্টার্ক বুঝিয়ে দিয়েছেন, অবসরের দিনক্ষণ নিয়ে তিনি এখনই ভাবছেন না। টেস্ট ক্রিকেটকে তিনি নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ হিসেবে দেখেন। অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে সময় কাটানো, সতীর্থদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া এবং ম্যাচ শেষে দলের সাফল্য উদ্যাপন—এসবই তাকে এখনও অনুপ্রাণিত করে।
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে তিনি সতীর্থ নাথান লায়নের একটি রসিক মন্তব্যও উল্লেখ করেন। লায়ন তাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিনি যেন এখনও সিঁড়ির প্রথম ধাপেই পা রেখেছেন এবং সামনে আরও অনেকটা পথ বাকি। স্টার্কের বক্তব্যেও সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি জানিয়েছেন, শরীর এখনও সঙ্গ দিচ্ছে এবং খেলা থেকে আনন্দও পাচ্ছেন। তাই আপাতত সামনে এগিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে স্টার্কের শুরুটাই ছিল ভয়ংকর। ম্যাচের প্রথম বলেই শাদমান ইসলামকে আউট করে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে স্বপ্নের সূচনা এনে দেন। এরপর দ্রুত আরও কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে ধস নামান। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেওয়ার স্পেলটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স।
এই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের তালিকাতেও আরও ওপরে উঠে এসেছেন স্টার্ক। দ্বিতীয় টেস্ট শেষে তার টেস্ট উইকেটসংখ্যা ৪৪৫-এ পৌঁছায়, যা তাকে তালিকার দশম স্থানে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শারীরিক সক্ষমতাই বড় প্রশ্ন
দ্রুতগতির পেসার হিসেবে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকা সহজ নয়। নিয়মিত টেস্ট খেলা, দীর্ঘ স্পেল করা, ম্যাচের পর পুনরুদ্ধার এবং চোটের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে একজন পেসারের ওপর চাপও বাড়তে থাকে। স্টার্কের ক্ষেত্রেও তাই ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তার ফিটনেস ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর।
তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে অবসরের কোনো তাড়াহুড়ো দেখা যাচ্ছে না। বরং শরীর যতদিন অনুমতি দেবে, ততদিন টেস্ট ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখার ইচ্ছাই প্রকাশ করেছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে স্টার্কের গুরুত্বও এখনও যথেষ্ট। বাঁহাতি পেসের কারণে তিনি প্রতিপক্ষের ব্যাটিংয়ে আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেন। নতুন বলে গতি ও সুইং, পুরোনো বলে রিভার্স সুইং এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তার অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় সম্পদ।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজটিও তার বর্তমান অবস্থানকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া নয় উইকেটে হেরে গেলেও দ্বিতীয় টেস্টে স্টার্কের নেতৃত্বে বোলিং আক্রমণ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়। দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হয়।
ফলে আপাতত স্টার্কের টেস্ট ভবিষ্যৎ নিয়ে অবসরের চেয়ে ধারাবাহিকতার কথাই বেশি প্রাসঙ্গিক। বয়স ৩৬ হলেও পারফরম্যান্সে তার গতি বা আগ্রাসনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি নির্ভর করবে তার শরীর, ফিটনেস এবং নিজের খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার ওপর। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর অন্তত এখনই টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি অস্ট্রেলিয়ার এই অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার।









