নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন!

নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি কাজ শেষ করে বিল উত্তোলনের চেষ্টা এবং খননের মাটি পাড়ে রেখে দেয়ার মতো নানা অনিয়ম চলছে। কৃষকরা এর প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে থানায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার হুমকি দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকার প্রকল্পে নদীকে খাল বানানো হলেও স্থানীয় ভূমি অফিসের নথিতে নদীই রয়ে গেছে।

নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন!

জানা গেছে, নেত্রকোনার মদনে গোবিন্দ্রশী গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত চাওয়াই নদীকে সম্প্রতি খাল দেখিয়ে চলছে এই খনন কাজ। ২০২২ এর ৬ জুন কাজ শুরু করে এ বছর ৩০ এপ্রিলে শেষ করার কথা থাকলেও কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে নদীতে জোয়ারের পানি চলে এসেছে
নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন!

এদিকে কাজের সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে চার কিলোমিটার খননের মধ্যে দুই কিলোমিটার খনন দেখিয়ে নদীর পাড়েই মাটি তুলে রাখায় আবারও ভরাট হচ্ছে খননের জায়গা। স্থানীয়রা এ অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তাদেরকে নানা রকম হুমকি—ধমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে এ সকল ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ করলে ঠিকাদাররা তাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড চাওয়াই নদীকে খাল বানালেও মদন ভূমি অফিসের তথ্যমতে নদীই রয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগসহ ভূমি অফিসের তথ্যমতে খরস্রোতা পুরনো নদীকে কিছু অসাধু কর্মকর্তা সরকারি টাকা লুটপাট করার জন্য নদী কেটে খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এ ব্যাপারে মদন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহনূর আলম জানান, কাগজপত্র অনুযায়ী চাওয়াই হচ্ছে নদী। কিন্তু সেখানে খাল খনন প্রকল্প কিভাবে হয়েছে সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ড বলতে পারবে। তারা এর চেয়ে বেশি জানেন না।

এদিকে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চাওয়াই খনন প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেলাল কন্সট্রাকশন কাজ বাস্তবায়ন করছে। চার কিলোমিটার চাওয়াই নদীর খনন কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৮১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮৮ টাকা।

কার্যাদেশ অনুযায়ী গত ২০২২ সালের ৬ জুন কাজ শুরু করে এ বছরের ৩০ এপ্রিল কাজ শেষ করার কথা থাকলেও কাজ শুরু হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে।

খনন কাজের দরপত্র অনুযায়ী ১৮.০০ থেকে ২৫.১৯ ফুট প্রস্থে অবস্থাভেদে গভীরতা ১০ থেকে ১২ ফুট থাকলেও কোন রকমে ড্রেনের মতো চলছে কাজ। এছাড়াও খননের জায়গা থেকে ৩৮ থেকে ৪০ ফুট দূরত্বে মাটি ফেলার কথা থাকলেও তড়িঘড়ি করে পাড়েই ফেলা হচ্ছে মাটি। ফলে বৃষ্টিতে আবার সেই মাটি ধসে নদী ভরাট হচ্ছে।
নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন!

এদিকে গত ২ মাসে ৪ কিলোমিটারের মধ্যে ইতোমধ্যে খনন সম্পন্ন দেখিয়েছে দুই কিলোমিটার। এরই মধ্যে নদীতে জোয়ারের পানি চলে আসায় নির্ধারিত সময় ৩০ এপ্রিলের মধ্যে খনন কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ার আশংকাও করছেন স্থানীয়রা।

এ সকল নানা অনিয়ম অভিযোগ তুলে গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক, রিপন মিয়া, আশরাফুল আলম, মতি মিয়াসহ অনেকেই বলেন, ‘সারা জীবন শুনেছি চাওয়াই হচ্ছে নদী। ‘

এ নিয়ে খনন প্রকল্পের তত্ত্বাবাধনকারী নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ—প্রকৌশলী ওবায়দুল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বার বার বলা হচ্ছে মাটি নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য। পাড়ে মাটি ফেলার নিয়ম নেই।

এ সকল নানা অনিয়ম অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ঠিকাদার মদনের সমকাল প্রতিনিধি মোতাহার আলম চৌধুরী ও প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিনিধি নূরুল আলম কামালসহ অজ্ঞাত তিন জনের বিরুদ্ধে মদন থানায় একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন।

মদনের প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিনিধি নূরুল আলম কামাল বলেন, খাল খননের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করায় নিজের অনিয়ম ঢাকতে ও আমাদের হয়রানি করার জন্য থানায় একটা মিথ্যা, ভিত্তিহীন চাঁদাবাজির অভিযোগ দেয় ঠিকাদারের লোকজন।

এ ব্যাপারে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তাওদীদুর রহমান জানান, একটি চাঁদাবাজির লিখিত অভিযোগ পেয়েছি।

খননে অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদেরকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন পুনরায় জানান, খননের কাজ চলমান রয়েছে। এ নিয়ে থানায় শুধু অভিযোগ করেছিলাম, এখন বুঝতেছি মামলা করতে হবে।

তবে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান জানান, পাড়ের মাটি সরিয়ে বিক্রি করার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও আমার পূর্বে যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা বলতে পারবেন নদীতে কিভাবে খাল খনন প্রকল্প করা হয়েছে।

Leave a Comment