চলতি বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়য়ের এ ঘোষণার পর থেকেই হজের নিবন্ধনে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, নিবন্ধনে আশানুরূপ সড়া মিলছে না বলে জানিয়েছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। এরইমধ্যে নতুন ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় ৫৭ হাজার টাকা মাথাপিছু বিমানভাড়া বাড়ানোসহ নানা কঠিন শর্তের বেড়াজাল জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে নির্ধারিত বিমানভাড়া আগের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তাই অনেকেই প্রি-রেজিস্ট্রেশন করলেও সামর্থ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় চূড়ান্ত নিবন্ধন থেকে সরে আসছেন অনেকেই বলে জানিয়েছেন হজ গমনেচ্ছুরা। দৈনিক ইত্তেফাক/ দৈনিক ইনকিলাব/ জাগো নিউজ
বৃহস্পতিবার হজ নিবন্ধন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ধর্ম মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে হজযাত্রী নিবন্ধনের সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। আর উল্লেখিত সময়ের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি উভয় ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করা যাবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে চলতি মাসের ৮ তারিখে হজ নিবন্ধন শুরু হওয়ার পর সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ প্রকাশিত ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৪৬৪ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। এরমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার ৭৩ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৫ হাজার ৩৯১ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। এর বিপরীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮ হাজার ৬৩৩ জন এবং বেসরকারিভাবে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৭ জন প্রাক নিবন্ধিত হয়েছেন।

আর্থিক কারনে সরে আসছেন অনেকেই,খরচ বাড়ায় হজের নিবন্ধনে ধীরগতি
চলতি বছর সরকারিভাবে হজ পালনে খরচ পড়বে ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৮ টাকা ও বেসরকারিভাবে এজেন্সির মাধ্যমে সর্বনিম্ন খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬১৮ টাকা। আর বিমান ভাড়ায় খরচ পড়বে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকা। অথচ গত বছর যা কিনা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এদিকে বিমান সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ১৫৫০ ডলার (নীট) এবং ২০২২ সালে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া ছিল ১৫৫৫ মার্কিন ডলার (নীট)। আর এবার এক লাফেই বিমান ভাড়া জনপ্রতি বেড়ে ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
গত বছরও সরকারিভাবে দুটি প্যাকেজের মধ্যে প্যাকেজ-১ এর খরচ বেড়েছে ৯৬ হাজার ৬৭৮ টাকা আর প্যাকেজ-২ এর খরচ এবার বেড়ে দাড়িয়েছে এক লাখ ৬১ হাজার ৮৬৮ টাকা। বেসরকারিভাবে হজ পালনেও গত বছরের তুলনায় এবার খরচ বেড়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৮৭৪ টাকা।

এবার পবিত্র হজ পালনে চারটি শর্ত দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে দেশটি জানায়, করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯),মেনিনজাইটিস এবং সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা গ্রহণ, পুর্বে যারা হজ পালন করেননি তাদের অগ্রাধিকার, সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১২ বছর ও কোনো মারাত্মক দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকা যাবে না ।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে চলতি বছরের ২৭ জুন (৯ জিলহজ) পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির সঙ্গে হজ চুক্তি অনুযায়ী, এবার বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ করতে পারবেন। এরমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৫ হাজার জন ও এক লাখ ১২ হাজার ১৯৮ জন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনের সুযোগ পাবেন।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মতিউল ইসলাম জানিয়েছেন, হজ নিবন্ধন শুরু হয়েছে। একটু ধীর গতিতে হচ্ছে। আমরা আশা করছি কোটা পূরণ হয়ে যাবে। হজ এজেন্সিগুলোর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। তারা নিবন্ধন করছে, তবে স্লো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, টাকা একটু বেশি, বিমান ভাড়া বেশি। অনেকে চাইলেও হয়তো যেতে পারবেন না। কিন্তু সেটি কোটা পূরণ হওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। তবে নিবন্ধনের সময় আরও কিছুটা বাড়াতে হবে।
এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর মে মাসের মাঝামাঝি হজের নিবন্ধন শুরু হয়। সেসময় হাতে সময় ছিল খুবই কম। এবার হজের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বেশ সময় পাওয়া যাওয়ায় পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরো মার্চ মাস জুড়েই নিবন্ধন কার্যক্রম চলার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষের দিকে নিবন্ধনের চাপ বেশি থাকবে।

হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানোসহ প্যাকেজমূল্য পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশে(আটাব)গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে আবেদনও জমা দিয়েছে।
এক প্রতিক্রিয়ায় হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের(হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ ও নানা সংকটের কারণে আর্থিক চাপ বাড়ায় করোনার আগে যারা প্রাক-নিবন্ধন করেছিলেন তাদের বাজেটেও টান পড়েছে। টার্গেটের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হজ প্যাকেজ ও বিমানভাড়ায় তাই অনেকেই সংগতি হারিয়েছেন। সৌদি আরব হজের খরচ না বাড়ালেও টাকার সঙ্গে ডলার ও রিয়ালের বিনিময় হার বাড়ায় চাপ পড়েছে প্যাকেজে। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি বিমানভাড়া কমানোর ব্যবস্থা নেন,তাহলে সংগতিহীন হজযাত্রীদের জন্য পথ সুগম হতে পারে।
এদিকে আটাব সভাপতি এস এন মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, সারা বিশ্বে আর্থিক মন্দার কারণে যে ডলার-সংকট বিরাজ করছে এতে হজযাত্রীদের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি হজে যাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবেন।
একজন বেসরকারি হজ এজেন্সির কর্ণধার বলেন, হজে যাওয়ার জন্য এজেন্সির মাধ্যমে ২৫৫ জন প্রাক-নিবন্ধিত হয়েছেন। কিন্তু গত ১৫ দিনে মাত্র এক জন নিবন্ধনের টাকা পরিশোধ করেছেন। খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে তারা এখন ওমরায় যেতে চাচ্ছেন। এ বছর আমার এজেন্সি থেকে ৫৫ জন হাজিও পাব কি না সন্দেহ রয়েছে ।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ৩ লাখ ৩১ হাজার ও ২০১৯ সালে ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ধার্য্য ছিল। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে হজে অংশ নিতে পারেননি কেউ। আর ২০২২ সালে হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৫ লাখ ২১ হাজার ১৫০ টাকা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে হজের ব্যয় বেড়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ১৫ টাকা। যেখানে কিনা এ বছর সৌদি সরকার হজের আনুষঙ্গিক ব্যয় কমিয়েছে। আরও বলা হয়, গত ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে হজযাত্রীদের নির্ধারিত বিমানভাড়া ক্রমাগতই বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৩ সালে সৌদি সরকার হজযাত্রীদের ভিসার আবেদন লজমেন্টের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু করেছে। আর নতুন এ নিয়মানুসাড়ে এ বছর সব হজযাত্রীকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ভিসার আবেদন করতে হবে। সে লক্ষ্যে হজযাত্রীদের পাসপোর্ট আপাতত ঢাকার আশকোনার হজ অফিসে জমা না দিয়ে নিজের কাছে সংরক্ষণের অনুরোধ জানিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে যারা পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন তাদের হজ অফিস থেকে পাসপোর্ট ফেরত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
এর আগে ৫ ফেব্রুয়ারি ধর্ম মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, হজযাত্রীদের ভিসার জন্য নিবন্ধনের তিন দিনের মধ্যে পাসপোর্ট ও করোনা ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট নিজ দায়িত্বে ঢাকার আশকোনার হজ অফিসে জমা দিতে হবে।
আরও দেখুনঃ
