খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই এপ্রিল ২০২৬, ৮:২৮ পিএম

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামে আট বছরের শিশু আতিকা আক্তারকে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জেরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচা নিহত হয়েছেন। পুলিশ মূল অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
Table of Contents
গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেল চারটার পর থেকে বনপারিল গ্রামের সৌদিপ্রবাসী দুদুল মিয়ার শিশুকন্যা আতিকা আক্তার নিখোঁজ হয়। দীর্ঘক্ষণ তাকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি প্রচার করা হয়। আতিকার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে গ্রামের এক শিশু প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানায় যে, সে আতিকাকে গ্রামের এক কিশোরের সঙ্গে যেতে দেখেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয়রা অভিযুক্ত কিশোর নাঈমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে আতিকাকে হত্যার কথা স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাত ১০টার দিকে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে আতিকার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল, যা থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের পর পরই সুযোগ বুঝে অভিযুক্ত কিশোর নাঈম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আতিকার মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তেজিত স্বজন ও স্থানীয় গ্রামবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা অভিযুক্ত নাঈমের বড় ভাই নাজমুল হোসেনকে (২৪) প্রথমে আটক করে। পরবর্তীতে তার বাবা পান্নু মিয়া (৪৫) এবং চাচা ফজলু মিয়াকে (৩০) ডেকে আনা হয়। রাত ১১টার দিকে উত্তেজিত জনতা এই তিনজনকে গণপিটুনি দেয়। গণপিটুনির ফলে ঘটনাস্থলেই পান্নু মিয়া ও ফজলু মিয়ার মৃত্যু হয়। উত্তেজিত জনতা তাদের মরদেহ পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নাজমুল হোসেনকে উদ্ধার করে পুলিশ প্রথমে মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে নিহত আতিকার মা আরিফা আক্তার বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মূল অভিযুক্ত নাঈমকে ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে শুক্রবার দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
মামলার আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও পরিচয় নিচে টেবিলে দেওয়া হলো:
| আসামির নাম | পরিচয় | বর্তমান অবস্থা |
| নাঈম (কিশোর) | মূল অভিযুক্ত | গ্রেপ্তার (পুলিশ হেফাজতে) |
| পান্নু মিয়া (৪৫) | নাঈমের বাবা | গণপিটুনিতে মৃত |
| ফজলু মিয়া (৩০) | নাঈমের চাচা | গণপিটুনিতে মৃত |
| নাজমুল হোসেন (২৪) | নাঈমের ভাই | গুরুতর আহত (ঢামেকে চিকিৎসাধীন) |
| মো. রনি (২২) | সহযোগী অভিযুক্ত | পলাতক (গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে) |
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধান অভিযুক্ত নাঈমকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দ্রুতই কিশোর আদালতে হাজির করা হবে। মামলার অন্য আসামি রনিকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, আহত নাজমুল হোসেনকে হাসপাতালের বিছানায় পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
নিহত আতিকার চাচা মো. আলমাস হোসেন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকরাম হোসেন জানান, আতিকার মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং বনপারিল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত অন্য দুই ব্যক্তির মরদেহও তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে গণপিটুনির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পৃথক মামলা বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। বর্তমানে বনপারিল গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
মন্তব্য