বিশ্বের অন্যসব দূষিত বায়ুর শহরকে পেছনে ফেলে প্রায়ই ১ নম্বরে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা

লন্ত যানবাহনের পেছনে কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে উড়ছে ধুলাবালু। ফলে বিশ্বের অন্যসব দূষিত বায়ুর শহরকে পেছনে ফেলে প্রায়ই ১ নম্বরে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা। শিল্পকারখানার দূষণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না গ্রামের মানুষও। ছয় ধরনের পদার্থ এবং গ্যাসের কারণে বাড়ছে দূষণ। এর মধ্যে ক্ষতিকর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণার (পিএম ২.৫) কারণেই দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে পরিস্থিতি ভয়ংকর হচ্ছে। বাস্তবায়ন হচ্ছে না আইন। উল্টো সর্বশেষ জারি হওয়া বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় ছাড় দেওয়া হয়েছে দূষণকে। পিএম ২.৫-এর সর্বনিম্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাড়িয়ে দূষণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাপবিদ্যৎ কেন্দ্রের কার্বন নিঃসরণের সর্বোচ্চ সীমা উন্নত দেশের মানমাত্রার চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্বের অন্যসব দূষিত বায়ুর শহরকে পেছনে ফেলে প্রায়ই ১ নম্বরে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা

গতকাল বুধবার রাজধানীর স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিঃসরণ মানমাত্রার পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

এতে মূল প্রবন্ধে ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুধাবন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বস্তুকণা ২.৫-এর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমিয়ে ৫ মাইক্রোগ্রাম করেছে।

 

বিশ্বের অন্যসব দূষিত বায়ুর শহরকে পেছনে ফেলে প্রায়ই ১ নম্বরে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা

 

অথচ বাংলাদেশে সম্প্রতি পাস হওয়া বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এ বায়ুর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম থেকে বাড়িয়ে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম করা হয়েছে। আর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্বন নিঃসরণের সর্বোচ্চ সীমা সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড এবং বস্তুকণার মানমাত্রা যথাক্রমে ঘনমিটারে ২০০, ২০০ এবং ৫০ মিলিগ্রাম করা হয়েছে, যা উন্নত দেশের মানমাত্রার চেয়ে নূ্যনতম ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি। উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের দেশে উন্নয়ন কর্মকাে নিঃসরণের মাত্রার যে মানদ মেনে চলে, সেই মানমাত্রা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তারা আমাদের দেশে কাজ করার সময় মানে না।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বিদেশিরা তাদের স্বার্থ আগে দেখে, সে অনুযায়ী তারা বাংলাদেশে গবেষণা করে। গবেষণাগুলো এ দেশের গবেষকদের দিয়ে করানো উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সব উন্নয়ন হতে হবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় মাথায় রেখে। উন্নয়নমূলক প্রকল্প নেওয়ার আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। এতে জনসাধারণের মতামত নেওয়া দরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনার সময় দূষণ বিবেচনায় নিতে হবে।

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি বলেন, আমাদের দেশে বড় প্রকল্পে স্বাস্থ্যের প্রভাব বিবেচনায় অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপণ করা দরকার। পরিবেশসম্মত হয় না এমন প্রকল্প বাতিল করা উচিত। ১ হাজার ইয়ুথ ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট তৈরি করতে হবে, যাতে তারা সব জায়গায় বাংলাদেশের ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরতে পারে।

নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম মনজুরুল হান্নান খান বলেন, যে উন্নয়ন মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সে উন্নয়ন কতটা কাম্য তা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভেবে দেখতে হবে।

বায়ুমান নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) ত্রুটিপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় করা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো এসব ক্ষেত্রে যা মানছে, তা আমাদের এখানে মানা হচ্ছে না।

 

বিশ্বের অন্যসব দূষিত বায়ুর শহরকে পেছনে ফেলে প্রায়ই ১ নম্বরে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা

 

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কার্বন নিঃসরণের জন্য আমাদের উপকূল ডুবছে। তবে আমরা নিজেরাই কার্বন নিঃসরণ করছি এবং বিভিন্ন ফোরামে দাবি তুলছি ক্ষতিপূরণের জন্য। আবহাওয়া বার্তার পাশাপাশি সরকারিভাবে বায়ুর মানমাত্রার তথ্যও প্রতিদিন প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ফিনল্যান্ডের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কো-ফাউন্ডার লরি মিল্লিভিরটা বলেন, কলকারখানায় কার্বন নিঃসরণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং আইন করে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মাহমুদা ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment