এ উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রপিকের প্রকাশ করা ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি ঘিরে প্রকাশিত প্রসপেক্টাসে এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিণতি, আইনি দায় নির্ধারণের জটিলতা এবং স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া এআই প্রযুক্তির বিকাশ মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর, এমনকি অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রসপেক্টাসে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কোন পরিস্থিতিতে এবং কোন বিচারব্যবস্থার আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এআই মডেলের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি, আত্মহত্যার মতো ঘটনা এবং শিশুদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকি থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কাও ঝুঁকির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, কিছুটা স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করা এআই এজেন্টকে ঘিরে সাইবার নিরাপত্তার ঘটনাগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির এই সতর্কতা শুধু প্রযুক্তি খাতের জন্য নয়, এআই ব্যবহারকারী বীমা কোম্পানি ও তাদের গ্রাহকদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো বীমা প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের তথ্য বিশ্লেষণ, দাবি যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনায় এআই ব্যবহার করলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আর্থিক ও আইনি ক্ষতি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের দাবি, প্রযুক্তি সরবরাহকারীর দায় এবং বীমা কোম্পানির নিজস্ব দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
Table of Contents
এআইয়ের তিন ধরনের ঝুঁকি, তিনটি বীমা প্রশ্ন
এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে দেখা হচ্ছে। প্রথমটি হলো এআই মডেলের তৈরি উত্তর, বিশ্লেষণ বা সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি। দ্বিতীয়টি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তার ঘটনা। তৃতীয়টি হলো, এআইয়ের অপ্রত্যাশিত আচরণে ক্ষতি হলে তার দায় কার ওপর বর্তাবে, সেই অনিষ্পন্ন প্রশ্ন।
প্রথম ধরনের ঝুঁকিতে পেশাগত দায়বদ্ধতা, পণ্যজনিত দায় এবং পরিচালকদের ও কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা-সংক্রান্ত বীমা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে কোন বীমা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষতির ধরন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্ব, পলিসির শর্ত এবং ঘটনার বিচারব্যবস্থার ওপর।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সাইবার বীমা গুরুত্বপূর্ণ। এআই এজেন্ট যদি অননুমোদিতভাবে কোনো ব্যবস্থা ব্যবহার করে, তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে অথবা স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পলিসিতে সেই ঘটনা অন্তর্ভুক্ত কি না, তা যাচাই করতে হবে। প্রচলিত সাইবার বীমার সব শর্তে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের ঝুঁকি স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে পলিসির ভাষা ও ব্যতিক্রমী শর্ত নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয় সমস্যাটি আরও জটিল। এআই ব্যবহারের ফলে অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হলে প্রযুক্তি নির্মাতা, প্রযুক্তি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারী কিংবা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর মধ্যে কার দায় কতটুকু, তা সব ক্ষেত্রে আগেভাগে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান বীমা পণ্যও সব ধরনের সম্ভাব্য দায়ের জন্য স্পষ্ট সমাধান দিতে পারে না।
প্রচলিত বীমা পলিসি কতটা প্রস্তুত
এআই এজেন্টের ব্যবহার বাড়লেও প্রচলিত বীমা পলিসি অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তির ঝুঁকি বিবেচনা করে তৈরি হয়নি। ফলে বীমা চুক্তিতে এআই-সম্পর্কিত ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে মতবিরোধের আশঙ্কা বাড়ছে।
পেশাগত দায়বদ্ধতা বীমার বাজারে এআই নিয়ে নীরবতা বা অস্পষ্টতার পরিবর্তে এখন স্পষ্ট শর্ত যুক্ত করা কিংবা নির্দিষ্ট ঝুঁকি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণায় প্রতি পাঁচজন বীমা পেশাজীবীর একজন জানিয়েছেন, তাঁদের বীমাকৃত গ্রাহকেরা ইতিমধ্যে এআই-সংশ্লিষ্ট ক্ষতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু বীমা পলিসি কেনা যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝতে হবে, তাদের ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, কোন তথ্য ব্যবহার করে, কতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে এবং ভুল হলে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কী। একই সঙ্গে বীমা চুক্তিতে এআই-সম্পর্কিত ক্ষতি, তথ্য ফাঁস, সাইবার হামলা, তৃতীয় পক্ষের দাবি এবং আইনি ব্যয়ের সুরক্ষা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিয়ন্ত্রক নজরদারি
এআই ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ ৭ অক্টোবর এআই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। এতে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, বীমা মধ্যস্থতাকারী এবং অর্থ পরিশোধের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর্থিক খাতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর রাখা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের জুনে সাত সদস্যের একটি এআই কর্মীগোষ্ঠী গঠন করেছে। দেশটির বীমা খাতের জন্য আনুষ্ঠানিক এআই পরিচালন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হংকংয়ের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ এবং জাপানের আর্থিক সেবা সংস্থাও এআই ব্যবহারের তদারকির নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে একটি অভিন্ন প্রবণতা স্পষ্ট: এআই ব্যবহারের ফলে কী ধরনের ফলাফল তৈরি হচ্ছে, তার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
এর প্রভাব বীমা কোম্পানি ও তাদের গ্রাহক—উভয়ের ওপর পড়তে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করে আর্থিক বা পেশাগত সেবা দিচ্ছে, তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তথ্য সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের পলিসির শর্ত নতুন প্রযুক্তির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করতে হবে।
এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে বীমা খাতকে
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও তার ঝুঁকি মোকাবিলার নীতিমালা ও আইনি কাঠামো সব বাজারে সমান গতিতে এগোচ্ছে না। অ্যানথ্রপিকের প্রসপেক্টাসে উঠে আসা সতর্কতা এই ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রযুক্তির নির্মাতা নিজেই যখন সম্ভাব্য ক্ষতির দায় নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানায়, তখন এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজেদের ঝুঁকি ও বীমা সুরক্ষা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে পরিচালকদের ও কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বীমা, প্রযুক্তি ও পেশাগত ত্রুটিজনিত দায়বদ্ধতা বীমা এবং সাইবার বীমার ক্ষেত্রে বিদ্যমান শর্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এআই ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত কি না, কোন পরিস্থিতিতে দাবি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা দরকার।
এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন থেমে থাকার সম্ভাবনা কম। ফলে ঝুঁকি মোকাবিলায়ও স্থির নীতির পরিবর্তে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বীমা কাঠামো হালনাগাদ করতে হবে। অ্যানথ্রপিকের পর ওপেনএআইয়ের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে নতুন করে এআই কোম্পানির তালিকাভুক্তি নয়, বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, দায়বদ্ধতা এবং ক্ষতিপূরণের নিয়ম কতটা স্পষ্ট করা হচ্ছে, সেটিই আগামী দিনে বীমা খাতের জন্য বড় বিবেচ্য হয়ে উঠবে।









