বরিশালে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কয়েকজন যুবককে মারধরের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য উপস্থিত না থাকায় অভিযানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে বরিশাল নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট বিএনপি ও ছাত্রদল নেতারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, মনিরুজ্জামান ফারুক ও তাঁর সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীরা কয়েকজনকে আটক করে তল্লাশি চালাচ্ছেন। পরে আটক ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে ফারুকের সামনে হাজির করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দুই যুবককে চড়-থাপ্পড় মারতে দেখা যায়। এ সময় কয়েকজনকে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়েও আঘাত করা হয়।
ঘটনার বিষয়ে বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব নাভিদ রহমান তুষার বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা ওই এলাকায় অভিযান চালান। এ সময় মাদক সেবনরত অবস্থায় চারজনকে আটক করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আটকের পর স্থানীয় মুরব্বি ও অভিভাবকেরা তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের ভিত্তিতেই আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে অভিযান পরিচালনার আগে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলেও স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে, বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান ফারুক জানান, যে এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে, সেটি তাঁর নিজের এলাকা। সেখান থেকে চার থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছিল।
আটক ব্যক্তিদের মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে কী করব, তারা তো ছেড়ে দেয়। তাই উত্তমমাধ্যম দিয়ে আমরাও ছেড়ে দিয়েছি।’
তাঁর এমন বক্তব্যের পর মাদকবিরোধী কার্যক্রমের নামে কাউকে আটক ও শারীরিকভাবে আঘাত করার অধিকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযানে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে নিশ্চিত করেছেন আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক রেজাউল ইসলাম রেজা।
তিনি জানান, বিএনপি নেতারা অভিযানের বিষয়ে পুলিশকে আগে থেকে কিছু জানাননি। এ কারণে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। বরিশালে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না।
তিনি জানান, তাঁর কার্যালয়ের পাশেই বিএনপি নেতারা অভিযান পরিচালনা করলেও ঘটনার সময় তিনি বিষয়টি জানতে পারেননি। পরে ঘটনাটি তাঁর নজরে আসে।
এদিকে, মাদক নির্মূলে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করলেও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সরাসরি অভিযান পরিচালনার পক্ষে নন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমান।
তিনি বলেন, মাদক নির্মূলের উদ্যোগের সঙ্গে তিনি একমত। তবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব প্রশাসনের। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা চাইলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে পারেন।
অভিযানটির আইনগত বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু আল রায়হান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া অন্য কারও এ ধরনের অভিযান পরিচালনার আইনগত এখতিয়ার নেই।
তাঁর মতে, মনিরুজ্জামান ফারুকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানটি আইনবহির্ভূত। স্থানীয় বাসিন্দারা মাদকসহ কাউকে আটক করলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা উচিত।
মাদক নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা, স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাদকবিরোধী উদ্যোগের নামে কাউকে মারধর কিংবা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টি আইনগত প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বরিশালের এই ঘটনাতেও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের অভিযান পরিচালনা, আটক ব্যক্তিদের তল্লাশি এবং শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ভূমিকা ও প্রশাসনের দায়িত্বের সীমারেখা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।









