,

টেসলা রোডস্টার প্রদর্শনের মাধ্যমে উড়ন্ত গাড়ির স্বপ্নকে পুনরুজ্জীবিত করলেন ইলন মাস্ক

একসময় ইলন মাস্কের উড়ন্ত গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন অনেকে। ২০১৮ সালে জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক জো রোগানের অনুষ্ঠানে এমন গাড়ি তৈরির ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাস্ক। তখন তাঁর এই ধারণাকে অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়েছিল। তবে আট বছর পর সেই পরিকল্পনা আবারও আলোচনায় এসেছে। টেসলার নতুন রোডস্টার গাড়ির উড়তে সক্ষম একটি সংস্করণের প্রদর্শনী করে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ম্যাকগ্রেগরে স্পেসএক্সের একটি কেন্দ্রে গত বৃহস্পতিবার এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেখা যায়, টেসলার নতুন নকশার একটি রোডস্টার গাড়ি ওপরের দিকে উঠে শূন্যে ভেসে থাকে। এরপর গাড়িটি বাতাসে ডিগবাজি খেয়ে আবার নিরাপদে নিচে নেমে আসে। ব্যতিক্রমী এই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন মাস্ক।

ভিডিওটির সঙ্গে তিনি লেখেন, ‘দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সত্যিই উড়ন্ত গাড়ি থাকবে।’ তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তবে প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি সাধারণ সড়কে চলাচলের উপযোগী গাড়িতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০১৮ সালে ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে মাস্ক জানিয়েছিলেন, টেসলার পরবর্তী প্রজন্মের রোডস্টারে স্পেসএক্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে রকেট বা কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার যুক্ত করার ধারণার কথা বলেছিলেন তিনি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়িটিকে মাটি থেকে ওপরে তোলা কিংবা বাতাসে ভাসিয়ে রাখার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন মাস্ক।

কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সংকুচিত গ্যাস নির্দিষ্ট দিকে বের করে দিয়ে বিপরীতমুখী বল তৈরি করা হয়। মহাকাশযানের অবস্থান ও দিক নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে গাড়িতে এই ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হলে শক্তি সরবরাহ, ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সে সময় মাস্কের পরিকল্পনাটি অনেকের কাছে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হয়েছিল। সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে রকেট প্রযুক্তির সমন্বয় বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। পডকাস্টের উপস্থাপক জো রোগানও তাঁর বক্তব্য শুনে হেসেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর দুই বছর পর, ২০২০ সালে জনপ্রিয় মার্কিন টেলিভিশন উপস্থাপক ও গাড়িপ্রেমী জে লিনোর সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন মাস্ক। লিনো মন্তব্য করেছিলেন, মাস্ক কখন রসিকতা করেন আর কখন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে সত্যিই সিরিয়াস থাকেন, তা বোঝা কঠিন। জবাবে মাস্ক জানিয়েছিলেন, উড়ন্ত রোডস্টার তৈরির ধারণাটি নিয়ে তিনি শতভাগ সিরিয়াস।

সাম্প্রতিক প্রদর্শনী সেই পুরোনো পরিকল্পনাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তবে প্রদর্শনীতে গাড়িটির শূন্যে ওঠা ও ডিগবাজি খাওয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও, এর প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। গাড়িটি কীভাবে ওপরে উঠেছে, কতক্ষণ বাতাসে থাকতে পারে এবং এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তরও এখনো পাওয়া যায়নি।

মাস্কের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন নকশার এই রোডস্টার ২০২৮ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়ার কথা। তবে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজারে আসা গাড়িতে রকেট থ্রাস্টার প্রযুক্তি যুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একইভাবে গাড়িটির চূড়ান্ত নকশা, দাম, বাস্তব ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন

উড়ন্ত গাড়ির ধারণা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমন যান তৈরির চেষ্টা করছে, যা সড়কে চলার পাশাপাশি আকাশেও চলাচল করতে পারবে। তবে এ ধরনের যান বাস্তবে ব্যবহার করতে হলে শুধু উড্ডয়নের সক্ষমতা থাকলেই চলে না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, জরুরি অবতরণের সুবিধা, যাত্রী সুরক্ষা এবং প্রযোজ্য বিমান ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে চলা।

রকেট থ্রাস্টার ব্যবহার করে কোনো গাড়িকে সাময়িকভাবে ওপরে তোলা গেলেও সেটিকে দৈনন্দিন যাতায়াতের উপযোগী করে তোলা ভিন্ন বিষয়। বিশেষ করে জনবহুল সড়ক, আবাসিক এলাকা কিংবা যানজটপূর্ণ শহরে এমন গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, গ্যাস বা জ্বালানির ব্যবহার, যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের খরচও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে হলে এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন হবে।

মাস্কের সাম্প্রতিক প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় আনলেও এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রদর্শনীতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গাড়িটির উড্ডয়ন দেখানো হয়েছে; কিন্তু সাধারণ ক্রেতারা নিরাপদে ও নিয়মিত এটি ব্যবহার করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।

একসময় অসম্ভব বলে মনে হওয়া একটি ধারণাকে বাস্তব পরীক্ষার পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি তুলে আলোচনায় এসেছেন মাস্ক। তবে তাঁর এই উদ্ভাবন ভবিষ্যতের যাতায়াতব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনবে, তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।