,

ধর্ষণ-চাঁদাবাজি-হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ বাড়ছে, কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি কোথায়?

হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অপরাধের ঘটনায় দেশে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধ দমনে সরকারের নানা উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চললেও মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ কতটা ফিরেছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত পরিসংখ্যান পরিস্থিতির অন্য একটি দিক তুলে ধরছে। অপরাধের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব নির্বিশেষে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

কয়েক দিনের হত্যাকাণ্ডে অপরাধের ভয়াবহ চিত্র

গত ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে শিরিন বেগমের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর শরীর চার টুকরা করা হয়েছিল। দাম্পত্য কলহের জেরে তাঁকে হত্যার অভিযোগে স্বামী দুলাল হাওলাদারকে আটক করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি উঠে আসে।

এর এক দিন পর, ১৩ অক্টোবর ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সুফিয়া আক্তার নিশিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর স্বামী আব্দুল মান্নান মনিরের বিরুদ্ধে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অভিযুক্ত নিজেই জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। এর আগে ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে অন্তঃসত্ত্বা সীমা রানী দাসকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাঁর স্বামীকে আটক করা হয়।

এসব ঘটনায় পারিবারিক বিরোধ ও দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে প্রতিটি ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণের জন্য পৃথক তদন্ত প্রয়োজন। ঘটনাগুলো নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি শনাক্ত এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। ঘরের ভেতরে সংঘটিত সহিংসতা অনেক সময় বাইরের মানুষের নজরে আসে না। ফলে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের পর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ সামনে আসে। পুলিশ জানায়, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। ঘটনাটি শিশু-কিশোরীদের নিরাপত্তা, যাতায়াতের ঝুঁকি এবং অপরিচিত ব্যক্তির ওপর নির্ভরতার বিষয়গুলো সামনে এনেছে।

অন্যদিকে, ১১ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অটোরিকশাচালক রাজন মিয়াকে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যার পর তাঁর গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে যাত্রীবেশে ওঠা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। পুলিশ অটোরিকশাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে সাহেব আলী নিহত হন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

একই সময়ের মধ্যে সংঘটিত এসব ঘটনা অপরাধের ধরন ও প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা তুলে ধরে। কোথাও পারিবারিক বিরোধ, কোথাও যৌন সহিংসতা, আবার কোথাও ছিনতাই বা অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, অপরাধের ধরন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং তদন্তের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিন মাসের পরিসংখ্যানে উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, নারী ও শিশু নির্যাতন, গণপিটুনি এবং অন্যান্য সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৬৯টি ঘটনায় নয়জন নিহত এবং অন্তত ৫৪০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষের ৩১টি ঘটনায় একজন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ১৬টি ঘটনায় দুজন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।

এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিরোধ, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংঘর্ষ ঘটেছে। অন্তত ৫১টি ঘটনায় ১৫৩টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা অগ্নিসংযোগের অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।

রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যুক্ত হলে সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ মানুষ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। এ ধরনের ঘটনায় অপরাধীদের পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করা জরুরি।

একই তিন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় অন্তত ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। এসব পরিসংখ্যান আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং বিচারবহির্ভূত শাস্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অপরাধের বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়াই আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২৫৩ জন ধর্ষণের শিকার, যাঁদের ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যার তথ্যও দিয়েছে সংগঠনটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতায় ১৩৭ জন নারী নিহত হয়েছেন। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৮৯ শিশুর প্রাণহানির তথ্যও রয়েছে। এসব সংখ্যা নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ সহজ করা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিথিলতা দেখা দিলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মরদেহ উদ্ধার, কারাগারে মৃত্যু ও সাংবাদিক নির্যাতন

এইচআরএসএসের হিসাবে, তিন মাসে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি মরদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৯টি বস্তাবন্দি, ১৯টি গলাকাটা এবং ১৯টি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার সব কটির পেছনে একই ধরনের কারণ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ, পরিচয় এবং অপরাধের সম্ভাব্য যোগসূত্র আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, তিন মাসে অন্তত ৩৭ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে পাঁচজন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে একজনের মৃত্যুর তথ্যও দিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া ৮৮টি ঘটনায় ১৩৫ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছে এইচআরএসএস।

এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য, প্রতিটি ঘটনার তদন্তের ফলাফল এবং বিচারিক অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। তবে কারাগারে মৃত্যু, হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনা যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মনে করেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঠেকাতে সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের উদ্যোগ ও পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

গত ৮ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজধানী, খুলনা এবং চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সেখানে সরকারি জমির ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এলাকাটিতে সারদার আদলে পুলিশ অ্যাকাডেমি স্থাপন এবং পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পুলিশের ওপর জনআস্থা অর্জন ও তা ধরে রাখাকে বড় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

তবে মাঠপর্যায়ের কয়েকটি ঘটনা পুলিশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। খুলনায় দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হওয়ার পর রাতে একা চলাচল না করার বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পুলিশের সদস্যদের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তদন্ত কমিটি গঠনের খবরও পাওয়া যায়।

১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাঁর মতে, বিগত শাসনামলে পুলিশের ভূমিকা এবং তা নিয়ে জনঅসন্তোষ বাহিনীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কার্যকর পুলিশিংয়ে ফিরতে আরও সময় প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেক অপরাধী পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানও বলেছেন, বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে একা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি পরিমাপ করা যায় না। অপরাধের পুনরাবৃত্তি, তদন্তের মান, অভিযোগপত্র দাখিল, বিচার নিষ্পত্তি এবং দণ্ড কার্যকরের অগ্রগতিও মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

সমান আইন প্রয়োগই আস্থার মূল শর্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি বিবেচনা না করে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা বাধার মুখে পড়ে। কোনো ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্য ঘটনায় শিথিলতা দেখানো হলে আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।

তিনি আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলোও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সদিচ্ছার কথা বলেছে; মূল ঘাটতি ছিল কার্যকর বাস্তবায়নে। মাঠপর্যায়ে বাধাগুলো চিহ্নিত করা, বাহিনীর পেশাগত স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় প্রয়োজন। অপরাধী যে-ই হোক, তদন্ত, অভিযোগপত্র ও বিচারপ্রক্রিয়ায় একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ চলতে থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

অপরাধ দমনে ঘাটতি কোথায়?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ও মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান থেকে অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অপরাধী চক্রের তৎপরতা মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার জরুরি। তৃতীয়ত, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত সক্ষমতা, মনোবল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মানেই বিচার শেষ হওয়া নয়। সুষ্ঠু তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, সময়মতো অভিযোগপত্র এবং নিরপেক্ষ বিচার ছাড়া অপরাধের স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন।

সরকার পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলছে, আর মাঠপর্যায়ের ঘটনা ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উদ্বেগের চিত্র উঠে আসছে। এই দুইয়ের ব্যবধান দূর করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাফল্য শেষ পর্যন্ত অভিযান বা গ্রেপ্তারের সংখ্যায় নয়, বরং মানুষ কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে এবং অপরাধের শিকার হলে কতটা দ্রুত ন্যায়বিচার পাচ্ছে—তার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।