ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী প্লেব্যাক গায়ক অভয় যোধপুরকর। তাঁর মতে, মুনাফা অর্জন এবং বেশি সংখ্যক গান তৈরির প্রতিযোগিতায় সংগীতের সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব ও শিল্পীদের স্বাধীনতা ক্রমেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বলিউডে করপোরেট মানসিকতার প্রভাব বাড়তে থাকায় সংগীতের শৈল্পিক দিকটি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে যোধপুরকর মনে করেন, একটি গানের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার সুর, আবেগ, সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক মানের ভিত্তিতে। শুধু গানটি কতটা জনপ্রিয় হলো কিংবা কত আয় করল, সেটিকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
হিন্দি, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম ও মারাঠি ভাষার সংগীতে কাজ করেছেন এই গায়ক। এ আর রহমান এবং অজয়-অতুলের মতো খ্যাতিমান সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করার সুবাদে ভারতীয় সংগীতের বৈচিত্র্য এবং এর সঙ্গে যুক্ত সৃজনশীল চ্যালেঞ্জগুলো কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
যোধপুরকরের পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে সংগীত তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ অনেক সময় সৃজনশীল সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। সংগীত পরিচালকদের কাছ থেকে এমন গান প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা সহজেই শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাবে এবং বাজারে ভালো সাড়া ফেলবে। একই সঙ্গে প্রযোজক ও সংগীত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে শিল্পীদের নিজস্ব চিন্তা ও পরীক্ষামূলক কাজের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
বলিউডের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যোধপুরকর বলেছেন, হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্প পুঁজিবাদের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সংগীত প্রযোজনার সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকলেও শিল্পের স্বাধীনতাকে কেবল মুনাফার হিসাব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। দ্রুত বেশি গান তৈরি করার প্রতিযোগিতায় যদি প্রতিটি কাজের পেছনে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও সৃজনশীলতা দেওয়ার সুযোগ কমে যায়, তাহলে গানের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই উদ্বেগ শুধু নতুন শিল্পীদের ঘিরে নয়। যোধপুরকরের মতে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি থাকা সংগীত পরিচালকেরাও সব সময় নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা পান না। এ আর রহমানের মতো প্রতিষ্ঠিত সংগীতজ্ঞের ক্ষেত্রেও সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সব পরিস্থিতিতে সমান থাকে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, শিল্পীর খ্যাতি থাকলেই যে বাণিজ্যিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে কাজ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
হিন্দি চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন যোধপুরকর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ আর রহমান তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে পরিচিত করে তোলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অপরিচিত কণ্ঠকে নিয়ে কাজ করার বিষয়ে পরিচালক ও প্রযোজকদের মধ্যে অনীহা ছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতজগৎ থেকে উঠে আসা একজন শিল্পীকে হিন্দি চলচ্চিত্রে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা যথেষ্ট আগ্রহ দেখাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতা নতুন শিল্পীদের জন্য চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কঠিন বাস্তবতাকেও সামনে আনে। প্রতিভা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক গায়ককে পরিচিতি অর্জনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিষ্ঠিত নাম, আগের বাণিজ্যিক সাফল্য এবং বাজারে গ্রহণযোগ্যতার হিসাব অনেক সময় নতুন শিল্পীদের সম্ভাবনাকে আড়াল করে দেয়। ফলে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর কিংবা ভিন্নধারার সংগীতের জন্য উপযুক্ত শিল্পী হয়েও অনেকে প্রয়োজনীয় সুযোগ পান না।
যোধপুরকরের মতে, শিল্পীর প্রতিভা বিচার করার ক্ষেত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা বা বাণিজ্যিক অবস্থানই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য, সংগীতের প্রতি উপলব্ধি, আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টির সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিল্পের মূল্য যদি শুধু বাজারের চাহিদা দিয়ে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে নতুন ভাবনা ও ব্যতিক্রমী সংগীতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য একই ধরনের গান বারবার তৈরি করার প্রবণতা শ্রোতাদের সংগীত উপভোগের অভিজ্ঞতাকেও সীমিত করতে পারে। পরিচিত সুর ও জনপ্রিয় ধারার গান সহজে বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পেলেও সংগীতের জগৎ তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। নতুন সুর, ভিন্ন সংগীতধারা, ব্যতিক্রমী বিন্যাস এবং পরীক্ষামূলক কাজ শ্রোতাদের সামনে নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এসব কাজের জন্য পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে সংগীতের বৈচিত্র্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতে শিল্প ও বাণিজ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক অবশ্য দীর্ঘদিনের। চলচ্চিত্রের গান সিনেমার প্রচার, দর্শকের আগ্রহ এবং প্রযোজনার আর্থিক সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই প্রযোজক ও সংগীত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জনপ্রিয়তা এবং আয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যদি শিল্পীর নিজস্বতা ও সৃজনশীল স্বাধীনতা উপেক্ষিত হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সংগীতের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন শিল্পীদের সুযোগ দেওয়া, সংগীত পরিচালকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা সৃষ্টিগুলোকে উৎসাহিত করা জরুরি বলে যোধপুরকরের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক বাস্তবতা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও শিল্পের মৌলিকত্ব রক্ষার জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
অভয় যোধপুরকরের মন্তব্য ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে সৃজনশীলতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্পীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন, নতুন প্রতিভার জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং সংগীতের স্বকীয়তা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা।
যোধপুরকরের দৃষ্টিতে, ভারতীয় সংগীতের ভবিষ্যৎ শুধু কত বেশি গান তৈরি হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং সেই গানগুলো কতটা মৌলিক, আবেগপূর্ণ ও শৈল্পিক হয়ে উঠছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রিয়তা ও মুনাফার প্রতিযোগিতার মধ্যেও সংগীতের নিজস্ব সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য এবং সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখাই শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য জরুরি।









