পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কোম্পানিটির সঙ্গে অনুষ্ঠিত গভর্ন্যান্স রিভিউ সভার সিদ্ধান্ত এবং বিমা আইন, ২০১০-এর ৫১(গ) ধারা অনুসারে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইডিআরএর সহকারী পরিচালক মোছা. মারুফা আক্তার পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জারি করা এক চিঠিতে এ নিয়োগের কথা জানায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আইডিআরএর উপপরিচালক (নন-লাইফ) মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত চিঠিতে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, মারুফা আক্তার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত থাকবেন এবং সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আইডিআরএকে জানাবেন। তবে পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁর কোনো ভোটাধিকার থাকবে না। তিনি বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোট দিতে পারবেন না, পাশাপাশি কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামত দেওয়ারও সুযোগ থাকবে না।
কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবকে বোর্ড সভার নোটিশসহ পর্যবেক্ষককে নিয়মিত আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
তবে পর্যবেক্ষক নিয়োগের চিঠিতে গভর্ন্যান্স রিভিউ সভায় আলোচিত কোনো নির্দিষ্ট অনিয়ম বা অভিযোগের বিবরণ দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন কোনো অনিয়মের কারণে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
পরিচালক নির্বাচন নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপট
তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে আইডিআরএর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর পেছনে রয়েছে পরিচালক নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ। কোম্পানিটির ২৫তম বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালক নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি তদন্ত করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
আইডিআরএর নির্দেশনায় বলা হয়, তদন্তে ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা, ২০২৪’-এর ১১(২) বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত ভোটের ফলাফল ও কোম্পানির ঘোষিত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
তদন্তের ভিত্তিতে পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করে প্রকৃত ভোটে নির্বাচিত পাঁচজনকে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য কোম্পানিটিকে ২০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানায়, নির্দেশনাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে জানুয়ারিতে জারি করা এক নির্দেশনায় আইডিআরএ সতর্ক করে দেয়, তাদের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বিমা আইন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়তে পারে।
এই বিরোধের মধ্য দিয়ে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের গঠন, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। বিমা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি ও আইন মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিচালকদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে।
রিট দায়ের নিয়ে পরিচালকদের অভিযোগ
পরিচালক নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ একপর্যায়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। চলতি বছরের মে মাসে কোম্পানিটির কয়েকজন পরিচালক আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।
অভিযোগকারী পরিচালকদের দাবি, রিটের বিষয়টি বোর্ড সভায় আলোচনা করা হয়নি এবং এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তাঁদের অভিযোগের মধ্য দিয়ে কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
পর্যবেক্ষক নিয়োগের প্রভাব কী হতে পারে
পর্যবেক্ষক নিয়োগের ফলে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আইডিআরএ সরাসরি তথ্য পাবে। পর্যবেক্ষক ভোট দিতে বা সিদ্ধান্তে মতামত জানাতে না পারলেও সভায় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানানোর দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানিটির বোর্ড কার্যক্রমের ওপর নজরদারি জোরদার হতে পারে। বিশেষ করে আগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, পরিচালক নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এ নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে পর্যবেক্ষক নিয়োগের অর্থ এই নয় যে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নতুন কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে। নিয়োগের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আইডিআরএর চিঠিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
এখন কোম্পানিটি কীভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং পরিচালনা পর্ষদসংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে কী পদক্ষেপ নেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আইডিআরএ ভবিষ্যতে কোনো নতুন নির্দেশনা দেয় কি না, সেটিও নজরে থাকবে।









