,

অধ্যাপক মেহের কবীর: জ্ঞানচর্চা থেকে মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত

শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সমাজকল্যাণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন অধ্যাপক মেহের কবীর। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানার্জন, শিক্ষাদান ও মানবিক দায়িত্ব পালনের এক অনন্য সমন্বয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা বিকাশে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শিশুদের কল্যাণ এবং মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনেও কাজ করেছেন। বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ইতিহাসে রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

মেহের কবীরের বিশেষত্ব ছিল জ্ঞানচর্চাকে কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। শিক্ষকতা, লেখালেখি ও অনুবাদের পাশাপাশি সমাজের প্রয়োজনের প্রতি দায়িত্বশীল থাকাও ছিল তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর জীবন ও কর্ম শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পারস্পরিক সম্পর্ককে তুলে ধরে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

অধ্যাপক মেহের কবীরের জন্ম ১৯২১ সালের ৫ জুন দিনাজপুরে। শৈশব থেকেই পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ ও স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ১৯৪২ সালে ফলিত রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের সংযোগ ছিল। জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অধীনে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন উপমহাদেশের রসায়ন গবেষণা ও বিজ্ঞানশিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ। গবেষণার প্রতি নিষ্ঠা, যুক্তিনির্ভর চিন্তা এবং জ্ঞান অন্বেষণের যে ঐতিহ্য তিনি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন, তা বিজ্ঞানশিক্ষার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মেহের কবীরের শিক্ষাজীবন ছিল সেই বৃহত্তর জ্ঞানচর্চার ধারার অংশ। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা ও অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে।

শিক্ষকতায় গড়ে তোলেন বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম

১৯৪৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে মেহের কবীরের পেশাগত জীবনের সূচনা হয়। পরে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন এবং একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন।

শিক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলাও ছিল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানচর্চায় প্রশ্ন করার মানসিকতা, তথ্য যাচাই এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর দক্ষতা বিশেষ প্রয়োজন। তাঁর কর্মজীবন শিক্ষার এই বিস্তৃত তাৎপর্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি রোকেয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মপরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছিল। শিক্ষার্থীদের আবাসিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের দায়িত্বে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতাও প্রয়োজন।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সাহিত্য ও অনুবাদ

মেহের কবীরের আগ্রহ কেবল রসায়ন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। লেখালেখি ও অনুবাদচর্চার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বিভিন্ন রচনা অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সাহিত্যিক ভাবনা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

অনুবাদ একটি ভাষার সাহিত্যকে অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পরিচিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে নতুন চিন্তা, সংস্কৃতি ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। মেহের কবীরের অনুবাদচর্চা তাঁর সাহিত্যপ্রীতি এবং জ্ঞান বিনিময়ের প্রতি আগ্রহের পরিচয় বহন করে।

বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞান মানুষকে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে। সাহিত্য মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সমাজবাস্তবতাকে বুঝতে সাহায্য করে। এই দুই ধারার প্রতি মেহের কবীরের আগ্রহ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

তাঁর জীবন থেকে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে পড়ে। বিজ্ঞান শুধু গবেষণাগার কিংবা শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়; দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক অগ্রগতি ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, বেদনা ও প্রতিকূলতার স্মারক। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার হন বহু নারী। স্বাধীনতার পর এসব নারীর পুনর্বাসন, সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব।

মেহের কবীর নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনকেন্দ্রের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। এ দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজে যুক্ত হন।

যুদ্ধের পর নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন ছিল বহুমাত্রিক একটি চ্যালেঞ্জ। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক অবহেলা, বৈষম্য এবং মর্যাদার সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর পাশাপাশি সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিল।

এ ধরনের উদ্যোগের তাৎপর্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার স্বীকার করা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। মেহের কবীরের এ কর্মকাণ্ড তাঁর সমাজসেবামূলক মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।

শিশুকল্যাণেও ছিল সক্রিয় সম্পৃক্ততা

নারীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি শিশুদের কল্যাণেও কাজ করেছেন মেহের কবীর। তিনি বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিশুদের সুরক্ষা, বিকাশ ও কল্যাণে তাঁর এই সম্পৃক্ততা সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়।

শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য শিক্ষা, যত্ন, নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য। শিশুকল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলো এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে মেহের কবীরের দায়িত্ব পালন তাঁর পেশাগত জীবনের বাইরেও সমাজের প্রতি সক্রিয় অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত।

তাঁর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়—মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও শ্রম কাজে লাগানো। শিক্ষকতা তাঁকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করেছে, বিজ্ঞানচর্চা যুক্তিনির্ভর চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছে, আর সমাজকল্যাণমূলক কাজ তাঁকে মানুষের বাস্তব সমস্যা মোকাবিলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে।

বহুমাত্রিক জীবনের প্রাসঙ্গিকতা

অধ্যাপক মেহের কবীরের জীবনকে শুধু একজন শিক্ষকের পেশাগত সাফল্য দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর অবদানের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যাবে না। বিজ্ঞান, সাহিত্য, অনুবাদ ও মানবকল্যাণে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন শিক্ষকের প্রভাব শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষার্থীদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গঠনেও তা ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে, বিজ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যপ্রীতি মানুষের জ্ঞান ও উপলব্ধির পরিসরকে বিস্তৃত করতে পারে।

মেহের কবীরের জীবন ও কর্ম স্মরণ করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে অবদান রাখাও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সাহিত্যচর্চা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর জীবনাদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে। তাঁর অবদান স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর মূল্যবোধকেও ধারণ করা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।