আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো অভিষেক হয়নি বাংলাদেশের রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলামের। ঘরোয়া ক্রিকেটে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের সুবাদে আলোচনায় আসা এই বোলার এবার জাতীয় দলের ওয়ানডে স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে অনুষ্ঠেয় ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের জন্য ১৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। লিটন কুমার দাসের নেতৃত্বাধীন এই দলে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ফরম্যাটে ডাক পেয়েছেন আলিস।
বিপিএলে নিজের বোলিংয়ের বৈচিত্র্য দিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আলিস আল ইসলাম। তাঁর রহস্যময় বোলিংয়ের ধরন ও ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা তাঁকে অন্য স্পিনারদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে সাফল্য পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই দক্ষতা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। জাতীয় দলের ওয়ানডে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তি তাঁকে সেই সুযোগের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
টি-টোয়েন্টির পর ওয়ানডে দলেও সুযোগ
আলিস প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পান ২০২৪ সালে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য। বিপিএলে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নির্বাচকদের নজরে আসার পর তাঁকে দলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চোটের কারণে সেই সিরিজে মাঠে নামা হয়নি তাঁর। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়।
এরপরও নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন এই স্পিনার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে আনঅফিশিয়াল ওয়ানডে সিরিজে খেলেছেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্য যাচাই করার সুযোগ দিয়েছে। এশিয়ান গেমসের জন্য বাংলাদেশের দলেও ডাক পেয়েছিলেন আলিস। যদিও সেবার মূল একাদশে জায়গা হয়নি তাঁর।
এবার ওয়ানডে দলের ১৬ সদস্যের তালিকায় নাম ওঠায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের সম্ভাবনা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে স্কোয়াডে থাকা আর একাদশে সুযোগ পাওয়া এক বিষয় নয়। দলের কৌশল, প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ এবং কন্ডিশন বিবেচনা করেই চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচন করবেন টিম ম্যানেজমেন্ট। সুযোগ পেলে আলিসকে নিজের বোলিংয়ের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে।
লিটনের নেতৃত্বে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়
ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য ঘোষিত বাংলাদেশ দলে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি তরুণদেরও রাখা হয়েছে। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন লিটন কুমার দাস, আর সহ-অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়। ব্যাটিং বিভাগে রয়েছেন তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব ও পারফরম্যান্স দলের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
দলে অলরাউন্ডার ও স্পিন বোলিংয়ের একাধিক বিকল্প রয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, রিশাদ হোসেন, তানভীর ইসলাম এবং আলিস আল ইসলামকে নিয়ে স্পিন বিভাগে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পেস আক্রমণে আছেন তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, হাসান মাহমুদ ও শরীফুল ইসলাম। সাইফউদ্দিনও রয়েছেন ১৬ সদস্যের এই স্কোয়াডে। উইকেটকিপার হিসেবে দলে আছেন নুরুল হাসান সোহান।
ওয়ানডে ক্রিকেটে সাফল্য পেতে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। ৫০ ওভারের ম্যাচে মাঝের ওভারগুলোতে রান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত উইকেট নেওয়া এবং শেষ দিকে কার্যকর ব্যাটিং অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে দেয়। তাই দল নির্বাচনের পাশাপাশি মাঠে ক্রিকেটারদের ভূমিকার সঠিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা
সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠেয় এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকবে। আফগানিস্তান সীমিত ওভারের ক্রিকেটে স্পিন বোলিংয়ের জন্য পরিচিত। অন্যদিকে জিম্বাবুয়েকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। দুই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে।
আরব আমিরাতের কন্ডিশনে উইকেটের আচরণ বুঝে বোলার নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উইকেটে স্পিনাররা সহায়তা পেলে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় স্পিন আক্রমণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আবার পেসারদেরও নতুন বল ও ইনিংসের শেষ দিকে দায়িত্বশীল বোলিং করতে হবে। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে শুরুতে ভালো ভিত গড়া এবং মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট ধরে রেখে রান বাড়ানো হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৭ অক্টোবর শুরু বাংলাদেশের অভিযান
সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৭ অক্টোবর আবুধাবিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ শুরু করবে বাংলাদেশ। এরপর ২১ অক্টোবর শারজাহতে আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে লিটনের দল। একই ভেন্যুতে ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ফাইনাল।
স্বল্প সময়ের এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথম ম্যাচে জয় পেলে দল আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরের লড়াইয়ে নামতে পারবে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের ব্যাটিং ও বোলিং পরিকল্পনা যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হবে।
আলিস আল ইসলামের জন্য সিরিজটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পেয়েও চোটের কারণে খেলার সুযোগ না পাওয়া এই বোলার এবার ওয়ানডে দলে জায়গা করে নিয়েছেন। এখন তাঁর সামনে লক্ষ্য হবে চূড়ান্ত একাদশে সুযোগ পাওয়া এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগানো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হলে সেটি হবে তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বাংলাদেশের ১৬ সদস্যের ওয়ানডে দল
অধিনায়ক: লিটন কুমার দাস
সহ-অধিনায়ক: তাওহীদ হৃদয়
ব্যাটার: তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত
অলরাউন্ডার ও স্পিনার: সাইফউদ্দিন, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন, তানভীর ইসলাম, আলিস আল ইসলাম
উইকেটকিপার: নুরুল হাসান সোহান
পেসার: তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, হাসান মাহমুদ, শরীফুল ইসলাম
আলিসের অন্তর্ভুক্তি দল ঘোষণার অন্যতম আলোচিত দিক হলেও বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য থাকবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এই সিরিজে নতুন সমন্বয়গুলো কতটা কার্যকর হয়, সেটিও নজরে থাকবে। আর আলিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এবার কি অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হবে তাঁর?









