,

আজিজুর রহমান: চলচ্চিত্রে মানবিকতার অনন্য এক কারিগর

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নির্মাতার নাম তাঁদের সৃষ্টিশীলতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান তাঁদেরই একজন। চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি তুলে ধরেছেন মানুষের হাসি-কান্না, জীবনের কঠিন বাস্তবতা, সামাজিক অসংগতি এবং মানবিক সম্পর্কের নানা দিক। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র শুধু দর্শককে বিনোদন দেয়নি, বরং সমাজ ও জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতেও শিখিয়েছে।

আজিজুর রহমানের পরিচালিত ‘ছুটির ঘণ্টা’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় সৃষ্টি। একটি শিশুর অসহায়ত্ব ও মর্মান্তিক পরিণতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র আজও দর্শকের মনে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রে তিনি শিক্ষার গুরুত্ব, আত্মমর্যাদা এবং মানুষের জীবন পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন।

তাঁর চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পকে এমনভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা, যাতে দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে তার মিল খুঁজে পান। আবেগনির্ভর গল্প বলার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জন্ম, শৈশব ও শিল্পীসত্তার বিকাশ

আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১০ অক্টোবর, তৎকালীন বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলের সান্তাহার রেলওয়ে জংশন শহরের কলসা সাঁতাহার মহল্লায়। তাঁর পিতার নাম রুপচাঁন প্রামাণিক।

শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। স্থানীয় আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি ঢাকা সিটি নাইট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে চারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউটে কমার্শিয়াল আর্ট বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

চিত্রকলার এই শিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। দৃশ্যের বিন্যাস, চরিত্রের অভিব্যক্তি এবং আবেগের যথাযথ উপস্থাপনা চলচ্চিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। চারুকলার শিক্ষায় অর্জিত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে দৃশ্যের সৌন্দর্য ও গল্পের আবেগকে একসূত্রে গাঁথতে সহায়তা করেছিল।

চলচ্চিত্র পরিচালনায় তাঁর স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে ওঠার পেছনে এই শিল্পবোধের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি পর্দায় শুধু ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেননি; চরিত্রের অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গল্পকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন।

সহকারী পরিচালক থেকে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা

১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশামের সহকারী হিসেবে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়।

সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অভিনয় পরিচালনা, দৃশ্যায়ন, কাহিনির বিন্যাস এবং পর্দায় গল্প উপস্থাপনের কৌশল সম্পর্কে তাঁর ধারণা ক্রমে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে স্বতন্ত্র নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে।

তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান’। ময়মনসিংহের লোকগাথাভিত্তিক এই চলচ্চিত্রে বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে চলচ্চিত্রের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়।

বাংলার লোককাহিনি, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত গল্প দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব উপাদান চলচ্চিত্রে তুলে ধরার মাধ্যমে নির্মাতারা স্থানীয় সংস্কৃতিকে বৃহত্তর দর্শকসমাজের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পান। আজিজুর রহমানের প্রথম দিকের কাজেও সেই সাংস্কৃতিক আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়।

কর্মজীবনের শুরু থেকেই মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা এবং আবেগের বিষয়গুলো তাঁর চলচ্চিত্রে গুরুত্ব পেয়েছে। সহজবোধ্য গল্পের মধ্য দিয়ে দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ছিল তাঁর নির্মাণশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

‘অশিক্ষিত’: শিক্ষার আলোয় বদলে যাওয়ার প্রত্যয়

আজিজুর রহমানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘অশিক্ষিত’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। চলচ্চিত্রটির মূল বক্তব্যে রয়েছে শিক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং ব্যক্তিজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা।

শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ায় এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করে। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে—এই ধারণাও চলচ্চিত্রটির সামাজিক বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো দেশে শিক্ষার প্রসার দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শিক্ষার সুযোগ একজন ব্যক্তির পাশাপাশি তাঁর পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রে এমন একটি সামাজিক বাস্তবতাকে আবেগঘন ও সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার যে দক্ষতা আজিজুর রহমান দেখিয়েছেন, এটি তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

‘ছুটির ঘণ্টা’: যে বেদনা আজও দর্শককে নাড়া দেয়

আজিজুর রহমানের নাম উচ্চারিত হলে সবার আগে যে চলচ্চিত্রটির কথা মনে পড়ে, সেটি ‘ছুটির ঘণ্টা’। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এর কাহিনি, আবেগঘন উপস্থাপনা এবং মর্মান্তিক পরিণতি ছবিটিকে দীর্ঘদিনের জন্য দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে দিয়েছে।

চলচ্চিত্রটির গল্পে একটি শিশু স্কুলের বাথরুমে আটকে পড়ে। স্কুল ছুটি হয়ে যায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু শিশুটি থেকে যায় চার দেয়ালের মধ্যে, বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে।

সময়ের সঙ্গে তার ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ভয় বাড়তে থাকে। সাহায্যের আশায় অপেক্ষা করতে করতে শিশুটির অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বাইরে স্বাভাবিক জীবন চলতে থাকলেও স্কুলের ভেতরে আটকে থাকা শিশুটির জন্য প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের।

গল্পটি শেষ পর্যন্ত এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। শিশুটির অসহায় অপেক্ষা, বেঁচে থাকার আকুতি এবং তাকে উদ্ধার করতে না পারার পরিণতি দর্শকের মনে গভীর বেদনা তৈরি করে।

তবে ‘ছুটির ঘণ্টা’ কেবল একটি শিশুর মৃত্যুর গল্প নয়। এর ভেতরে রয়েছে দায়িত্বহীনতা, অবহেলা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শক্তিশালী বার্তা। সামান্য অসতর্কতা কীভাবে একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে এবং একটি পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী শোকের মধ্যে ফেলে দিতে পারে, চলচ্চিত্রটি তা মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য স্থানের নিরাপত্তা এবং ছুটির পর কেউ কোথাও আটকে আছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো তাদের সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ছবিটির মূল বার্তা এসব দায়িত্বের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি বড় শক্তি হলো, এটি দর্শকের মধ্যে শুধু দুঃখ তৈরি করে থেমে থাকে না; বরং দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার প্রশ্নও সামনে আনে। শিশুটির পরিণতি দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে—আরও একটু সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা কিংবা সময়মতো খোঁজ নেওয়া কি এমন পরিণতি ঠেকাতে পারত?

একটি চলচ্চিত্রের সাফল্য অনেক সময় তার বাণিজ্যিক অর্জনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব তৈরির মধ্য দিয়ে। ‘ছুটির ঘণ্টা’ সেই অর্থে আজিজুর রহমানের অন্যতম স্মরণীয় কাজ। ছবিটি শেষ হওয়ার পরও এর বেদনা দর্শকের মনে থেকে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে এর আবেদন টিকে থাকার পেছনে রয়েছে সেই গভীর মানবিক অনুভূতি।

বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্রজীবন

‘ছুটির ঘণ্টা’ ও ‘অশিক্ষিত’-এর বাইরে আজিজুর রহমান আরও বহু চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর কাজের বিষয়বস্তুতে পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, নৈতিক সংকট এবং সমকালীন বাস্তবতার নানা দিক উঠে এসেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মাটির ঘর’, ‘অতিথি’, ‘স্বীকৃতি’, ‘অপরাধ’, ‘গরমিল’, ‘মায়ের আঁচল’ ও ‘জনতা এক্সপ্রেস’।

এসব চলচ্চিত্রে মানুষের সম্পর্ক, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক জীবনের পরিচিত পরিস্থিতি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে এসেছে। সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত কাহিনি দর্শকের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রেও সেই প্রবণতা দেখা যায়।

বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উর্দু চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মেরে আরমান মেরে স্বপ্নে’, ‘সাত সেহেলী’, ‘পরদেশী’ ও ‘রেহেনে দো’।

বিভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত কর্মপরিধিকে বিস্তৃত করেছিল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে তিনি নিজের নির্মাণদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন।

পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল। ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘রঙিন রূপবান’, ‘কাঞ্চনমালা’ ও ‘জিদ’ তাঁর প্রযোজনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর পরিচালিত ও প্রযোজনাসংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি এবং কাজের বৈচিত্র্য তাঁর কর্মজীবনের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চলচ্চিত্রে তুলে ধরার উদ্যোগ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম, মানুষের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দেশের সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রে নানা সময়ে উঠে এসেছে।

এই ইতিহাসকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার আগ্রহ থেকে আজিজুর রহমান ২০১৬ সালে ‘মাটি’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাকে চলচ্চিত্রে ধারণ করা কেবল অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের মানবিক দিক, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারে। জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংযোগ তৈরি করতেও চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‘মাটি’ নির্মাণের উদ্যোগ আজিজুর রহমানের শিল্পীসত্তার আরেকটি দিক তুলে ধরে। তবে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া বা মুক্তির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া এর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে নির্দিষ্ট দাবি করা সমীচীন নয়।

মরণোত্তর একুশে পদক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন আজিজুর রহমান। তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ওই বছর তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একুশে পদক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদক দেওয়া হয়। আজিজুর রহমানের নাম এই সম্মানের জন্য মনোনীত হওয়া দেশের চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানকে নতুন করে আলোচনায় আনে।

তবে একজন শিল্পীর মূল্যায়ন কেবল পুরস্কার বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর সৃষ্টিকর্ম কতটা মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে, সময়ের পরিবর্তনের পরও কতটা প্রাসঙ্গিক রয়েছে এবং সমাজকে নতুন করে ভাবতে কতটা উৎসাহিত করেছে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

আজিজুর রহমানের ক্ষেত্রে ‘ছুটির ঘণ্টা’ ও ‘অশিক্ষিত’-এর মতো চলচ্চিত্র তাঁর শিল্পীসত্তার স্থায়ী পরিচয় বহন করে। একটি চলচ্চিত্র শিশুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন সামনে এনেছে, অন্যটি শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।

এই বিষয়গুলো সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব হারায়নি। বরং নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁর চলচ্চিত্রের সামাজিক বক্তব্য প্রাসঙ্গিক থাকার সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রয়াণ: মানুষটি নেই, রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি

২০২২ সালের ১৪ মার্চ কানাডার টরন্টোয় মৃত্যুবরণ করেন আজিজুর রহমান। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প হারায় একজন অভিজ্ঞ ও সৃজনশীল নির্মাতাকে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরে তাঁর মরদেহ জন্মস্থান সান্তাহারে সমাহিত করা হয়।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্মের আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। ‘ছুটির ঘণ্টা’র শিশুটির অসহায়ত্ব কিংবা ‘অশিক্ষিত’-এর শিক্ষার বার্তা আজও তাঁর কাজকে স্মরণ করার অন্যতম কারণ।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গল্পকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা, চরিত্রের আবেগ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরার দায়িত্ব তাঁরই। আজিজুর রহমানের কাজের মধ্য দিয়ে এই দায়িত্ব পালনের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

তাঁর চলচ্চিত্র দর্শককে কখনো কাঁদিয়েছে, কখনো সামাজিক অসংগতি নিয়ে ভাবিয়েছে, আবার কখনো শিক্ষার গুরুত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এভাবেই তাঁর নির্মাণশৈলী বিনোদনের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরন, প্রযুক্তি ও দর্শকের রুচিতে পরিবর্তন আসে। অনেক ছবি একসময় জনপ্রিয় হলেও পরে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু চলচ্চিত্র তাদের গল্প ও মানবিক আবেদন দিয়ে মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ‘ছুটির ঘণ্টা’ তেমনই একটি সৃষ্টি, যা আজিজুর রহমানকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।

তিনি পর্দায় তুলে ধরেছিলেন জীবনের নানা গল্প। সেই গল্পের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল মানুষের প্রতি মমতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং বাস্তবতাকে দেখার এক সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম, চলচ্চিত্রের চরিত্র এবং মানবিক বার্তা তাঁকে দর্শকের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।