এস এম সুলতানের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষকে তাঁর চিত্রকর্মের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাঁদের শ্রমে সভ্যতা টিকে থাকে, অথচ যাঁরা প্রায়ই সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদেরই তিনি এঁকেছেন অসাধারণ শক্তিমান ও আত্মবিশ্বাসী রূপে। তাঁর ছবিতে কৃষক দুর্বল কিংবা করুণার পাত্র নন; বরং তাঁরা ইতিহাসের নির্মাতা, উৎপাদনের প্রধান শক্তি এবং ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর।
শৈশব ও শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প
১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন যশোর জেলার বর্তমান নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। তাঁর পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। বাবা মেছের আলী ছিলেন পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং মা মাজু বিবি। পরিবারের আদরের নাম ‘লাল মিয়া’ দিয়েই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
অভাব-অনটনের মধ্যেই কেটেছে তাঁর শৈশব। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করতেন। সুযোগ পেলেই কাগজে ফুটিয়ে তুলতেন নিজের কল্পনার জগৎ। প্রতিকূল পরিস্থিতিও তাঁর সৃজনশীল মনকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। শৈশবেই তাঁর অসাধারণ চিত্রপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। কথিত আছে, ১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্থানীয় জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এঁকে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
তবে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। আর্থিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের স্বপ্নের প্রতি অটল বিশ্বাসই তাঁকে শেষ পর্যন্ত শিল্পজগতের স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে যায়।
কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে
শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় পাড়ি জমান এস এম সুলতান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় শিল্পসমালোচক ও লেখক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। সুলতানের প্রতিভা অনুধাবন করে তিনি তাঁকে শিল্পশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন এবং সহযোগিতা দেন।
১৯৪১ সালে সুলতান কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও জীবনবোধের ভিত্তিতে গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র চিত্রভাষা।
দেশভাগের আগে-পরে এবং পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। আন্তর্জাতিক শিল্পপরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান এবং বিভিন্ন স্থানে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। তবে বিশ্বশিল্পের নানা ধারার সংস্পর্শে এসেও তিনি নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।
বাংলার গ্রাম, কৃষিজীবী মানুষ, নদী, ফসলের মাঠ ও প্রকৃতিই হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পের প্রধান অনুপ্রেরণা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার গভীরতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিজের সমাজ, মানুষ ও জীবনবাস্তবতাকে কতটা নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা যায় তার ওপর।
ক্যানভাসে কৃষকের শক্তি ও আত্মমর্যাদা
এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর আঁকা কৃষকদের শক্তিশালী ও পেশিবহুল অবয়ব। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এসব চরিত্র সাধারণ বাস্তবতার অনুকরণ নয়; বরং কৃষকের অন্তর্নিহিত শক্তি, শ্রমের মর্যাদা এবং সমাজ গঠনে তাঁদের অবদানের প্রতীকী প্রকাশ।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষক খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আসছেন। অথচ তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন ও সামাজিক মর্যাদা সব সময় নিশ্চিত হয়নি। সুলতান তাঁর শিল্পে এই বৈপরীত্যের বিপরীতে কৃষককে প্রতিষ্ঠা করেছেন শক্তিমান, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে।
তাঁর ছবিতে কৃষকের শরীর যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা শক্তির প্রতিচ্ছবি। তাঁদের দৃঢ় পেশি শ্রমের ইতিহাস বহন করে, তাঁদের অবয়ব প্রকাশ করে আত্মবিশ্বাস, আর তাঁদের কর্মব্যস্ত জীবন তুলে ধরে সমাজের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক।
তাঁর ক্যানভাসে কৃষিকাজ, ফসলের প্রাচুর্য, গবাদিপশু, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছে বিস্তৃত জীবনচিত্র। প্রকৃতি সেখানে নিছক পটভূমি নয়; মানুষের জীবন, শ্রম ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সুলতানের এই শিল্পভাবনা প্রচলিত শিল্পচর্চার তুলনায় ছিল ব্যতিক্রমী। যেখানে অনেক শিল্পকর্মে অভিজাত জীবন, ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব কিংবা শহুরে বাস্তবতা গুরুত্ব পেত, সেখানে তিনি গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষকে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্থান। তাঁর ছবিতে কৃষক হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের নায়ক।
এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে তিনি কেবল কৃষকের শারীরিক শক্তিই তুলে ধরেননি, তাঁদের সামাজিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর শিল্পে রয়েছে বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা, শ্রমের স্বীকৃতি এবং মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।
নড়াইলে প্রত্যাবর্তন ও শিশুদের জন্য উদ্যোগ
১৯৫৩ সালে এস এম সুলতান নড়াইলে ফিরে আসেন। নগরজীবনের চাকচিক্য ও প্রতিষ্ঠার আকর্ষণের পরিবর্তে তিনি বেছে নেন নিজের পরিচিত জনপদ, গ্রামীণ পরিবেশ এবং মানুষের কাছাকাছি থাকার জীবন।
তাঁর কাছে শিল্পচর্চা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের মাধ্যম ছিল না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্যবোধ বিকাশের বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিশুদের স্বাধীনভাবে ভাবতে ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহিত করা গেলে একটি মানবিক ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই তিনি নড়াইলে ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিল্পচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তাদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শিশুদের জন্য তাঁর স্বপ্নের উদ্যোগ ‘শিশুস্বর্গ’। শিশুদের আনন্দ, স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশে এই উদ্যোগ তাঁর শিল্পদর্শনের মানবিক দিকটি তুলে ধরে।
শিল্পের বাইরেও সুলতানের জীবনযাপনে ছিল বৈচিত্র্য। তিনি বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। পশুপাখির প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা। সাপ, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, ময়না ও গিনিপিগসহ নানা প্রাণীর সঙ্গে তাঁর সময় কাটত।
প্রকৃতির প্রতি এই অনুরাগ তাঁর ব্যক্তিজীবন ও শিল্পকর্ম—উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার পরিবর্তে তিনি উদার, মুক্ত ও মানবিক জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতেন।
শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি ও সম্মাননা
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে একুশে পদক, রেসিডেন্ট আর্টিস্টের স্বীকৃতি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং স্বাধীনতা পদক।
১৯৮২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে রেসিডেন্ট আর্টিস্টের স্বীকৃতি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের সম্মাননা পান। ১৯৯৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় স্বাধীনতা পদক, যা বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
এ ছাড়া তাঁর জীবনী ও পরিচিতিমূলক বিভিন্ন লেখায় ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টারের ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকার ‘ম্যান অব এশিয়া’ স্বীকৃতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পুরস্কার ও সম্মাননার বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, বাংলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে শিল্পের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁদের জীবনকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দর্শককে শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করতে নয়, সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রয়াণের পরও অমলিন তাঁর শিল্পজগৎ
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এস এম সুলতান। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন হারায় এক স্বতন্ত্র শিল্পীকে। তবে তাঁর সৃষ্টি, জীবনদর্শন ও শিল্পভাবনা আজও তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
নড়াইলের মাটি, বাংলার কৃষক, প্রকৃতির প্রাণশক্তি এবং মানুষের আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা তাঁর শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পের কাজ শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য তুলে ধরা নয়; বরং সমাজের অবহেলিত মানুষকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা, মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং একটি জাতিকে তার শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করানোও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তাঁর ছবির কৃষকেরা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের শক্তিশালী শরীর, শ্রমনির্ভর জীবন এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন।
এস এম সুলতান ছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা এক স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর তুলিতে কৃষকের শ্রম পেয়েছে মহিমা, গ্রামীণ জীবন পেয়েছে নতুন ব্যাখ্যা, আর সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছেন অসাধারণ শিল্পসৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ক্যানভাসে বাংলার কৃষক আজও জীবন্ত। তাঁদের ঘামে ভেজা মাটি, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এবং দৃপ্ত অবয়বের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে তাঁর শিল্পীসত্তা। বাংলার মাটি ও মানুষের এই অমর চিত্রকরকে স্মরণ করা মানে দেশের কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং তাঁদের অবদানের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো।
মহান শিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।









