গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের একটি অংশ ভাড়ায় ডাকাতি করে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর জন্য তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ডাকাতির পর তারা দ্রুত ঢাকা ছেড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যায়। কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানোর চেষ্টা করে। চক্রগুলোর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
ব্যবসার আড়ালে ডাকাতির অভিযোগ
ভাড়াটে ডাকাতদের মধ্যে পাবনার চাটমোহর থানার নবীন পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম (৪৩) অন্যতম বলে অভিযোগ রয়েছে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ‘মেসার্স কৃষি ভান্ডার’ নামে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তিনি বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডাকাতিতে ব্যবহারের জন্য তাঁর কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক, হাতকড়া ও ওয়াকিটকি রয়েছে। ডাকাতির পর তিনি আবার নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যান। তাঁর বিরুদ্ধে সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় ডাকাতিসহ মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শহিদুলের সঙ্গে আরও ছয় থেকে সাতজনের একটি দল কাজ করে বলে জানা গেছে। গত ২৩ জুলাই রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় মোহাম্মদ রিয়াজ নামের এক ব্যবসায়ীর ১৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় এই দলটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামের এক ব্যক্তি তাদের ভাড়া করেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অপরাধে অভিজ্ঞ ডাকাতদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত অভিযান শেষ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়ার আগেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করা। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে কারা নির্দেশদাতা, কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে এবং কারা অর্থের জোগান দিয়েছে, তা আলাদাভাবে তদন্ত করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একাধিক মামলার আসামি জলিল মোল্লা
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত আরেক ব্যক্তি হিসেবে মো. জলিল মোল্লার নাম উঠে এসেছে। তাঁর বাড়ি বরিশালের খানপুরে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ডাকাতির পাঁচটি মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় দুটি, ঢাকা মহানগর পুলিশের ধানমন্ডি থানায় একটি এবং মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা রয়েছে। এসব মামলা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পরিধি সম্পর্কে ধারণা দিলেও প্রতিটি মামলার বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তাঁর ভূমিকা আদালতের নথি ও তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
ফ্রান্সে বসবাস, ডাকাতির অভিযোগ বাংলাদেশে
এই চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা আরেক ব্যক্তি বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিন। তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিমানযোগে ফ্রান্স থেকে ভারতে আসেন এবং পরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ডাকাতিতে অংশ নেন। তাঁর সঙ্গে শ্যালক শামীমসহ আরও কয়েকজন ভাড়াটে ডাকাত কাজ করেন বলে জানা গেছে।
ডাকাতি শেষে একই পথ ব্যবহার করে আবার ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এভাবে দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে তাঁর এই যাতায়াতপথ ও অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। সর্বশেষ উত্তরায় একটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় নাসিরকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা গ্রেপ্তার করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
একাধিক চক্র, ভাড়ায় ডাকাতির আলাদা কাঠামো
শুধু শহিদুল, জলিল কিংবা নাসির নন, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব চক্রের মধ্যে আল আমীন গ্রুপ, শাওন গ্রুপ এবং গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক সোর্স হিসেবে পরিচিত ডাকাত শহীদ গ্রুপের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া কিছু ব্যক্তিও এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করেন। অপরাধ সংঘটনের পর চক্রের সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আড়ালে আত্মগোপন করেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
ভাড়ায় ডাকাতির ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের চালান লুটের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বেড়ে কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, ডাকাতির পেছনে শুধু সরাসরি হামলাকারীরাই নয়, পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সরবরাহকারীদেরও ভূমিকা থাকতে পারে। ফলে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অর্থের লেনদেন, যোগাযোগের মাধ্যম এবং ঘটনার আগে-পরে তাদের চলাচল শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বাসে তুলে ব্যবসায়ীর টাকা ও মালামাল লুট
বিমানবন্দর এলাকায় এ ধরনের অপরাধের একটি উদাহরণ ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিলের ঘটনা। ওই দিন ভোরে সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে পৌঁছান কুষ্টিয়ার মো. রাশেদুল ইসলাম। ফ্লাইটের আগে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে তিনি ‘ওভারসিজ ট্রেনিং সেন্টার’-এর উদ্দেশে একটি বাসে ওঠেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাসের দরজা বন্ধ করে যাত্রীবেশে থাকা পাঁচ থেকে ছয়জন ডাকাত তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে মারধর করে। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা টাকা ও অন্যান্য মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে এমইএস ফ্লাইওভারসংলগ্ন জসিমউদ্দীন গোলচত্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনাটি বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অপরিচিত গাড়িতে ওঠা, যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা অপরাধী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার মতো কৌশল যাত্রীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রীদের কাছে নগদ অর্থ, মূল্যবান সামগ্রী ও ভ্রমণসংক্রান্ত নথি থাকায় তাঁরা অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।
অপরাধ দমনে নজরদারি ও অভিযান
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবির বলেন, বিমানবন্দরসহ উত্তরা এলাকায় অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যায়। তাদের গ্রেপ্তার করতে অনেক সময় কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
তাঁর ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত থাকায় ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমেছে। তবে অপরাধীদের দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং জামিনে মুক্তির পর পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা মোকাবিলায় নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, টহল এবং অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অপরাধীরা স্থান, সময় ও কৌশল পরিবর্তন করে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে। এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে।
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ডাকাতি প্রতিরোধে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধের পরিকল্পনাকারী এবং অর্থদাতাদের চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা, সন্দেহজনক গাড়ির চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা মোকাবিলায় সহায়তা মিলতে পারে।









