,

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যা, চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশার চালক গ্রেপ্তার

কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ধানক্ষেত থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৪) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এই হত্যাকাণ্ডে সুমন একাই জড়িত, নাকি এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শুক্রবার বিকেল সোয়া তিনটার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান। তিনি জানান, গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনা হচ্ছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি নির্জন পাকা সড়কের পাশের ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।

ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির আলামত, উল্টে পড়ে ছিল অটোরিকশা

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে নির্জন সড়কের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা উল্টে পড়ে থাকতে দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়। অটোরিকশাটির কাছাকাছি ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো ও দুমড়েমুচড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা।

এসব আলামত দেখে সেখানে ধাওয়া বা ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। পরে তাঁরা এগিয়ে গিয়ে কাদার মধ্যে মুখ গোঁজা অবস্থায় কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং অটোরিকশাটি জব্দ করে। ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা আলামত থেকে মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

অটোরিকশার সূত্র ধরে চালককে শনাক্ত

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অটোরিকশার নিবন্ধনের তথ্য ধরে এর মালিককে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন সুমন। পরে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর তিনি লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগে তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর আর সেখানে ফেরেননি।

তবে তাজমিনের সঙ্গে সুমনের পরিচয় ছিল কি না, তাঁদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত জানায়নি। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণে একাধিক স্থানে যাওয়ার সূত্র

তদন্তের অংশ হিসেবে নিহত শিক্ষার্থীর মুঠোফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করেছে পুলিশ। এতে তাঁর সাম্প্রতিক চলাচল সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। তবে মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, সেদিন তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিলেন। পরদিন, ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে যাত্রা করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামেন তাজমিন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা গেছে। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজেও তাঁকে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করতে দেখা যায়।

পরে তিনি সড়কের দিকে চলে যান। এরপর তাঁর চলাচলের আর কোনো দৃশ্য সংশ্লিষ্ট ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। পদুয়ার বাজার থেকে জগৎপুরের ধানক্ষেত পর্যন্ত তিনি কীভাবে পৌঁছেছিলেন, পথে কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং তাঁর শেষ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাবাকে পাঠিয়েছিলেন বার্তা ও লাইভ লোকেশন

মরদেহ উদ্ধারের পর তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বুধবার গভীর রাতে তাঁর মেয়ে মুঠোফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাঁকে আটকে রাখার কথা জানায়। একই সঙ্গে উদ্ধারের জন্য অনুরোধও করেছিল। তবে সে সময় তিনি ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পাননি।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের পাঠানো বার্তা দেখতে পান তিনি। পরে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।

তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাঁর বাবা আব্দুল আলিম ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেনেটার কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। পরিবারের আদি নিবাস যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে তাজমিন পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত।

একজন কিশোরীর বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত, বাবাকে পাঠানো উদ্ধার-অনুরোধের বার্তা এবং পরে নির্জন ধানক্ষেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলো তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীর বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপর হত্যাকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

তদন্তে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাজমিন কীভাবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত করেছিল, পদুয়ার বাজারে নামার পর কোথায় গিয়েছিল, তাঁর পাঠানো লাইভ লোকেশনের সঙ্গে মরদেহ উদ্ধারের স্থানের সম্পর্ক কী এবং ধানক্ষেতে পাওয়া আলামতগুলো কী নির্দেশ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

একই সঙ্গে অটোরিকশাটি কেন উল্টে পড়ে ছিল, ভ্যানিটি ব্যাগটি সেখানে কীভাবে এল এবং ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে ধানগাছ দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল, সেগুলোও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাজমিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আপাতত গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং মুঠোফোনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।