,

ডলারের বিপরীতে তলানির পথে রুপি, চাপে ভারতের অর্থনীতি

মার্কিন ডলারের বিপরীতে আবারও ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন বিনিময়মূল্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে ভারতীয় রুপি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য এবং ডলারের বাড়তি চাহিদা মুদ্রাটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করলেও রুপির দরপতন পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, লেনদেন শেষে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৯৬ দশমিক ৭৩। এর আগে ২০২৬ সালের মে মাসে ডলারের বিপরীতে রুপির দর ৯৬ দশমিক ৯৬-এ নেমেছিল, যা ছিল মুদ্রাটির সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থান। ফলে বর্তমান বিনিময়মূল্য সেই রেকর্ডের খুব কাছাকাছি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্য কিছুটা কমে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদহার হ্রাস পাওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন মুদ্রা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভারতীয় রুপি শক্তিশালী হতে পারেনি। বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো মুদ্রাটির ওপর চাপ বজায় রেখেছে।

আরবিআইয়ের হস্তক্ষেপেও কাটছে না সংকট

রুপির আরও দরপতন ঠেকাতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছে আরবিআই। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রি করেছে। এসব লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাধারণত কোনো দেশের মুদ্রার বিনিময়মূল্য দ্রুত কমতে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে পারে। এর ফলে ডলারের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দেওয়া এবং স্থানীয় মুদ্রার দরপতনের গতি সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এ ধরনের পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে অর্থ প্রত্যাহার করলে কিংবা আমদানিকারকদের ডলারের চাহিদা বেশি থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও মুদ্রার ওপর চাপ বজায় থাকতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আরবিআইয়ের পদক্ষেপে রুপির তাৎক্ষণিক ক্ষতি কিছুটা সীমিত হলেও বিনিময়মূল্যকে শক্তিশালী করার মতো পরিবর্তন এখনো ঘটেনি। বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী চাপ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্কতার সঙ্গে তা ব্যবহার করতে হয়।

সুদহার বাড়িয়েও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল

প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদহার বাড়ানোর পরও রুপির বিনিময়মূল্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। সাধারণত সুদহার বৃদ্ধি কোনো দেশের আর্থিক সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু বাস্তবে বিনিময়মূল্য শুধু সুদহারের ওপর নির্ভর করে না; বিদেশি বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিস্থিতিও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভারতের ক্ষেত্রে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার বড় চাপ হিসেবে কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে নিলে সেই অর্থের একটি অংশ ডলারে রূপান্তরিত হতে পারে। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং রুপির ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, ভবিষ্যতে রুপির দর আরও কমতে পারে—এমন আশঙ্কায় আমদানিকারক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে আগাম ব্যবস্থা নিচ্ছে। মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ওঠানামা থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত করার এই প্রক্রিয়াকে হেজিং বলা হয়। এর চাহিদা বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের লেনদেনেও প্রভাব পড়তে পারে।

মার্কিন ডলারের সাম্প্রতিক দুর্বলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদহার হ্রাস এশীয় মুদ্রাগুলোর জন্য সহায়ক হলেও ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপ সেই সুবিধাকে সীমিত করে রেখেছে।

তেলের উচ্চমূল্যে বাড়ছে আমদানি ব্যয়ের চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য ভারতের অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। পরে ইরান-সম্পর্কিত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।

তেলের দাম বাড়লে ভারতীয় আমদানিকারকদের একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি ডলার ব্যয় করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়তে পারে, যা রুপির বিনিময়মূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়েও পড়তে পারে। এসব খরচ বাড়লে পণ্য ও পরিষেবার দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সময়ে রুপির অবমূল্যায়ন ঘটলে বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের দাম স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেড়ে যেতে পারে।

ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা ভারতের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রুপির দুর্বলতা সেই ব্যয়ের প্রভাব আরও তীব্র করতে পারে।

চার সপ্তাহ ধরে কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। ২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৭৩৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেপ্টেম্বরে রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার কম। রয়টার্সে উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টানা চার সপ্তাহ ধরে রিজার্ভ কমেছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনে এই রিজার্ভ ব্যবহার করে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক দায় পরিশোধ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে রিজার্ভ একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

তবে রিজার্ভ কমার অর্থ সব সময় আর্থিক সংকট নয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজারে হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভের পরিমাণ ওঠানামা করতে পারে। কিন্তু মুদ্রার ওপর চাপের পাশাপাশি রিজার্ভের ধারাবাহিক হ্রাস বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

ভারতের বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ এখনো উল্লেখযোগ্য। ফলে রুপির দরপতন সীমিত করতে আরবিআইয়ের হাতে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের চাহিদা বেশি থাকলে সেই সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

আগামী মাসগুলোতেও দুর্বল থাকতে পারে রুপি

রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী তিন থেকে ছয় মাসে ডলারের বিপরীতে রুপি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি থাকতে পারে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে মুদ্রাটির উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে খুব বেশি আশাবাদ নেই।

জাপানের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময়মূল্য ৯৭ দশমিক ৫০-এ পৌঁছাতে পারে। তবে এটি একটি পূর্বাভাস, নিশ্চিত ফলাফল নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে এই হিসাব বদলে যেতে পারে।

রুপির দরপতন অব্যাহত থাকলে আমদানিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশ থেকে পণ্য ও কাঁচামাল কেনার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। ডলারে ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের রুপিভিত্তিক ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু রপ্তানিকারক দুর্বল রুপির কারণে সুবিধা পেতে পারেন। ডলারে আয় করা প্রতিষ্ঠান সেই অর্থ রুপিতে রূপান্তরের সময় তুলনামূলক বেশি অর্থ পেতে পারে। তবে উৎপাদনে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার কারণে এই সুবিধা সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমান হয় না।

রুপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর

ভারতীয় রুপির স্বল্পমেয়াদি গতিপথ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রবাহ, মার্কিন ডলারের অবস্থান এবং আরবিআইয়ের নীতিগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ মুদ্রাবাজারের আকস্মিক অস্থিরতা কমাতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রুপির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে একটি দেশের মুদ্রাকে স্থিতিশীল রাখা সহজ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উঁচু থাকা এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতেও রুপির ওপর চাপ বজায় থাকতে পারে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।