শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী ওসলোর নোবেল কমিটি এ পুরস্কার ঘোষণা করে। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী অবদান, বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা ও সাহসকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পিল্লাইয়ের কর্মজীবন কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের শিকার মানুষের পক্ষে আইনি লড়াই দিয়ে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু। পরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তাঁর বেড়ে ওঠার সময় দেশটিতে বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি আইন পেশায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা তাঁর বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইনের শাসন, সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নগুলো তাঁর কর্মজীবনে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান পিল্লাই। চার বছর পর তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ট্রাইব্যুনালটির সভাপতিও হন তিনি।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই গণহত্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন। ঘটনার পর দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
এই ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনকালে পিল্লাই ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে এসব কর্মকাণ্ড যে মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা গণহত্যার অংশ হতে পারে, তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
যুদ্ধ ও সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতাকে অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হতো। রুয়ান্ডার বিচারপ্রক্রিয়া এ ধরনের অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে পরিকল্পিত নিপীড়ন কিংবা গণহত্যার অংশ হিসেবে মূল্যায়নের গুরুত্ব সামনে আনে। এতে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় অধিক গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ঘৃণা ছড়ানো এবং গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের বিচারযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিচারিক কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে আইনি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘে দায়িত্ব
রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনের পর নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও কাজ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং নির্দিষ্ট শর্তে আগ্রাসনের অপরাধের অভিযোগে ব্যক্তির বিচার করে।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। এই দায়িত্বে থাকাকালে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষা, বৈষম্য মোকাবিলা এবং গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের সর্বজনীন মানদণ্ড রক্ষায় কাজ করা, লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা। পিল্লাইয়ের বিচারিক অভিজ্ঞতা এসব দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের অস্থায়ী বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ মামলার মধ্য দিয়ে গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে আসে।
এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্ব করেন পিল্লাই। ওই দায়িত্বে তাঁর কাজ ছিল সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তপ্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেওয়া।
ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির স্বীকৃতি
নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা তাঁর কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সহজ নয়। রাজনৈতিক চাপ, প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা না পাওয়ার মতো কারণে এসব মামলার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অপরাধের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং দায় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করে।
পিল্লাইকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে এ স্বীকৃতি মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিচারক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সেই প্রচেষ্টাকেও সামনে এনেছে, যাঁরা সংঘাত ও নিপীড়নের শিকার মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন।
তাঁর কর্মজীবন দেখিয়েছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি, আইনের শাসন শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের প্রচেষ্টাও। আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যকর রাখা এবং গুরুতর অপরাধের দায় নির্ধারণের প্রশ্নে তাঁর অবদান সেই বৃহত্তর লক্ষ্যকে তুলে ধরে।









